যে পরীক্ষা প্রমাণ করেছে, মহাকাশে পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র প্রতিস্থাপন ‘প্রায় অসম্ভব’

প্রতিদিনের ডেস্ক॥
বায়োস্ফিয়ার ২-এর ব্যর্থতা মনে করিয়ে দেয় : পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য পরিবেশ কৃত্রিমভাবে তৈরি করা ব্যয়বহুল, জটিল ও অনিশ্চিত।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা রাজ্যের নির্জন মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কাঁচে মোড়ানো বিস্ময়কর ভবন আজও বিজ্ঞান ও পরিবেশচিন্তার ইতিহাসে এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী অধ্যায় হয়ে আছে। ভবনটির নাম ‘বায়োস্ফিয়ার ২’। এ যেন মানবসৃষ্ট একটি ক্ষুদ্র পৃথিবী, যার ভেতরে আটজন মানুষ পৃথিবী থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে দু’বছর ধরে টিকে থাকার চেষ্টা করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল স্বনির্ভর বাস্তুতন্ত্রে টিকে থাকার সম্ভাবনা পরীক্ষা—যা ভবিষ্যতে মহাকাশে বসবাসের পথ খুলে দিতে পারে।
এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটির সূচনা হয় ১৯৯১ সালে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর সূত্রপাত আরো আগে, ১৯৭০-এর দশকে। প্রকল্পটির পেছনে ছিলেন মার্কিন ব্যবসায়ী ও দার্শনিক জন অ্যালেন। যার নেতৃত্বে পরিবেশবাদী একটি গোষ্ঠী নিউ মেক্সিকোর প্রত্যন্ত অঞ্চলে গড়ে তোলে একটি আত্মনির্ভরশীল জীবনধারার কমিউন। এই কমিউন থেকে জন্ম নেয় ‘স্পেস বায়োস্ফিয়ার ভেঞ্চারস’, যা বায়োস্ফিয়ার ২ নির্মাণে নেতৃত্ব দেয়।
ধনকুবের এড বাস প্রকল্পে বিনিয়োগ করেন প্রায় ১৫ কোটি ডলার (বর্তমান হিসেবে যা প্রায় ৪৪০ মিলিয়ন ডলার)। তারা কল্পনা করেছিলেন একটি কাচে ঘেরা বিশাল জৈব পরিবেশ, যেখানে থাকবে উষ্ণমণ্ডলীয় রেইনফরেস্ট, মরুভূমি, জলাভূমি, সাভানা ও একটি কৃত্রিম সমুদ্রসহ জীবন্ত প্রবালপ্রাচীর। তাদের লক্ষ্য ছিল, এই কৃত্রিম বাস্তুতন্ত্রে মানুষ কতদিন স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে টিকে থাকতে পারে তা বোঝা, ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযানের সম্ভাবনা যাচাই করা আর পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে গভীরতর ধারণা তৈরি করা।
১৯৯১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর আটজন বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও চিকিৎসক আনুষ্ঠানিকভাবে ভবনটির ভেতরে প্রবেশ করেন। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন এই ভবনের প্রতিটি উপাদান, যেমন: খাদ্য, পানি, অক্সিজেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—সবই নিয়ন্ত্রিত ছিল ভবনের অভ্যন্তরে। তারা তাদের নিজস্ব ফসল ফলাতেন, গবাদি পশু পালন করতেন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতেন আর বাতাস থেকে তৈরি অক্সিজেনে শ্বাস নিতেন।
বায়োস্ফিয়ার ২.১
বায়োস্ফিয়ার ২-এর ভেতরকার রেইনফরেস্ট
কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবতার ব্যবধান ছিল স্পষ্ট। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তারা শারীরিক দুর্বলতা, মানসিক চাপ ও বাস্তুতন্ত্রের অসামঞ্জস্যতার শিকার হন।
প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দেয় অক্সিজেনের মাত্রা ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ায়। শুরুর দিকেই বায়োস্ফিয়ার ২–এর অভ্যন্তরীণ অক্সিজেন ২১ শতাংশ থেকে নেমে আসে মাত্র ১৪ শতাংশে। যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১,০০০ ফুট উচ্চতার পরিবেশের সমান। বাসিন্দারা মাথাব্যথা, ক্লান্তি ও নিঃশ্বাসের কষ্টে ভুগতে শুরু করেন। অবশেষে, ১৬ মাস পর বাইরের অক্সিজেন সরবরাহ করতে বাধ্য হন বিজ্ঞানীরা, যা ছিল প্রকল্পের স্বনির্ভরতার ধারণার বিরুদ্ধে এক বড় ধাক্কা।
এই সংকটের মূল কারণ ছিল অত্যন্ত উর্বর ও জীবাণুসমৃদ্ধ মাটি, যা অতিরিক্ত অক্সিজেন ব্যবহার করে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করছিল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ গাছপালা এই কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে পর্যাপ্ত অক্সিজেন তৈরি করতে পারছিল না। ফলে গোটা বাস্তুতন্ত্রের জৈবচক্র ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়।
প্রকল্পের আরেকটি বড় সমস্যা ছিল পরাগবাহী পোকামাকড়ের বিলুপ্তি। ভবনের কাঁচের দেয়াল অতিবেগুনি রশ্মি আটকে দিচ্ছিল, ফলে পোকামাকড়ের জীবনচক্র বিঘ্নিত হয়। মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগবাহী পোকা মারা যেতে থাকে। এক পর্যায়ে বাসিন্দাদের হাত দিয়ে গাছের পরাগায়ন করতে হয়।
ফলনও আশানুরূপ হচ্ছিল না। খাদ্য সংকটে পড়ে বাসিন্দারা দৈনিক মাত্র ১,৮০০ ক্যালোরির কম খাদ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন। ওজন কমে যায়, শারীরিক দুর্বলতা বাড়ে, আর মানসিক চাপ তীব্র হয়।
বায়োস্ফিয়ার ২.২
বায়োস্ফিয়ার ২-এর জীবন যাপন
বাইরের বিশ্বে এই প্রকল্প শুরুতে বিজ্ঞানপ্রেমীদের উত্তেজিত করলেও পরে এটি সমালোচনার মুখে পড়ে। কেউ একে বলেছিলেন ‘সায়েন্স ফিকশনের ব্যর্থ অনুকরণ’, কেউ বলেছিলেন ‘নিউ-এজ ধর্মীয় প্রচার’, আবার অনেকে বলেছিলেন ‘অবৈজ্ঞানিক নাটক’।
বিশেষত যখন বাইরের অক্সিজেন প্রবেশ করানো হয়, তখন একে স্বনির্ভরতা পরীক্ষার ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যদিও প্রকল্পটি অনেক শিক্ষা দিয়েছিল, তবে তখনকার গণমাধ্যমগুলো প্রকাশিত সংবাদে একে চূড়ান্ত ব্যর্থ হিসেবেই উপস্থাপন করে।তবে ৩০ বছর পরে, বিজ্ঞানীরা আজ বায়োস্ফিয়ার ২–এর ব্যর্থতার মধ্যেও সাফল্য খুঁজে পেয়েছেন। এই প্রকল্প প্রমাণ করেছে, পৃথিবীর জৈব বাস্তুতন্ত্রের প্রতিস্থাপন অত্যন্ত কঠিন—প্রায় অসম্ভব।
ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির ইতিহাসবিদ লিসা র‍্যান্ড বলেন, ‘যখন ধনকুবেররা মহাকাশে বসবাসের স্বপ্ন দেখেন, তখন তারা ভুলে যান বায়োস্ফিয়ার ২ আমাদের কী শেখায়: পৃথিবীর মতো বাসযোগ্য পরিবেশ কৃত্রিমভাবে তৈরি করা দারুণ ব্যয়বহুল, জটিল ও অনিশ্চিত।’
পরিবেশবিদ ডেভিড টিলম্যান হিসেব করে দেখিয়েছেন, একজন মানুষকে মহাকাশে কৃত্রিম বাস্তুতন্ত্রে টিকিয়ে রাখতে মাসে ৮২,৫০০ ডলার ব্যয় হবে। তবে এর পরেও টিকে থাকার কোনো নিশ্চয়তা নেই।বর্তমানে বায়োস্ফিয়ার ২ অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখানে পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন, বাস্তুতন্ত্রের জটিলতা, প্রবালপ্রাচীরের বিলুপ্তি ও ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হচ্ছে।
প্রকল্পটির পরিচালনাকারী জন অ্যাডামস বলেন, ‘আমরা চাই বায়োস্ফিয়ার ২ হোক পরিবেশ গবেষণার লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার—যেখানে আমরা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষা চালিয়ে আমাদের পৃথিবীর জটিল পরিবেশকে বুঝতে পারি।
বায়োস্ফিয়ার ২–এর বাসিন্দা ও গবেষক মার্ক নেলসন বলেন, ‘আমরা সবাই এক বৃহৎ বায়োস্ফিয়ার বা পৃথিবীর বাসিন্দা। এই ছোট বায়োস্ফিয়ার আমাদের দেখিয়েছে, কীভাবে প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ফোঁটা জল মূল্যবান।’
বিবিসি অবলম্বনে

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়