১৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ১লা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার ফোনালাপট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার ফোনালাপ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছিল। রাজপথের আন্দোলনকারীদের দমাতে শুধু সামনাসামনি হামলা নয়, হেলিকপ্টার থেকেও হামলা চালানো হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে আসা নানা তথ্য-প্রমাণে জানা যায়, এসবের নির্দেশদাতা ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই। ট্রাইব্যুনালে সম্প্রতি প্রকাশিত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফোনালাপের রেকর্ড এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের বক্তব্য বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও বিচারিক প্রেক্ষাপটে এক গুরুত্বপূর্ণ সোপান রচনা করেছে। ট্রাইব্যুনালে বাজানো চারটি ফোনকল শুধু ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে নয়, রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহারের এক নগ্ন চিত্র প্রকাশ করেছে। এ ধরনের নির্দেশ শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, তা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদি আদালতে এসব প্রমাণিত হয়, তবে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে স্থান পাবে।‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ দমনে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার যে বিবরণ ফোনালাপের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত হয়েছে, তা শুধু বিস্ময়কর নয়, অত্যন্ত উদ্বেগজনকও। ফোনালাপগুলোতে আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র, হেলিকপ্টার থেকে বোম্বিং, ছত্রীসেনা নামানো এবং আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ ট্যাগ দিয়ে ফাঁসি দেওয়ার মতো কঠোর নির্দেশের কথা শোনা গেছে। ঢাকা দক্ষিণের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এস এম মাকসুদ কামাল এবং জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সঙ্গে শেখ হাসিনার ফোনালাপগুলো প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার আইনের তোয়াক্কা না করে চরম দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছিল। ফোনালাপের মাধ্যমে ড্রোনের ব্যবহার, ইন্টারনেটসেবা বন্ধ করা এবং আন্দোলনকে ‘জঙ্গি হামলা’ হিসেবে চিত্রিত করার যে কৌশলগত আলোচনা উঠে এসেছে, তা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে ভিন্নমত দমনের ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়ে তোলে। কারফিউ জারির পর কঠোরতা বজায় রাখা এবং ‘আর হেলিকপ্টার দিয়ে সোজা বোম্বিং করা হবে’-এমন নির্দেশের মাধ্যমে নজিরবিহীন বল প্রয়োগের মানসিকতা প্রকাশ পায়। অন্যদিকে দুদক চেয়ারম্যান আবদুল মোমেন জানিয়েছেন যে শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে ছয়টি দুর্নীতির মামলার রায় আগামী অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে হতে পারে। এ ঘোষণা যেমন জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে, তেমনি এটি প্রমাণ করে যে দীর্ঘদিনের অব্যাহত জবাবদিহির দাবি এখন আর এড়ানো যাচ্ছে না। রাজনৈতিক ক্ষমতার শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরাও আইনের ঊর্ধ্বে নন, এই বার্তাটি প্রতিষ্ঠিত করা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে এ পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আদালত যেন রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে সেদিকে সজাগ থাকা। সুষ্ঠু বিচার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রমাণ যাচাইয়ের মাধ্যমে এ মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করতে হবে। অন্যথায় জনগণের মধ্যে সন্দেহ থেকে যাবে যে এ বিচার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ছাত্র-জনতার রক্তরঞ্জিত পথ ধরে জুলাই-গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ আজ এক পরিবর্তিত বাস্তবতায় এসে দাঁড়িয়েছে। এখানে স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিই হতে পারে একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভিত্তি। সাবেক শাসকদের অপরাধ ও দুর্নীতির সঠিক বিচারের মাধ্যমে রাষ্ট্র শুধু অতীতের অন্ধকার অধ্যায় মুছে দিতে পারবে না, বরং গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। এটাই আজকের প্রধান চ্যালেঞ্জ এবং সর্বোচ্চ প্রয়োজন।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়