আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রায় ১৬ মাস অতিবাহিত হয়েছে। দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর পরিবর্তে আরো বেশি দুর্বল হচ্ছে। আরো বেশি পঙ্কে নিমজ্জিত হচ্ছে। শান্তি-স্বস্তির বদলে অস্থিরতা-উত্তেজনা বেড়ে চলেছে।রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ও আস্থাহীনতা চরমে। ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, খুনখারাবি মানুষের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। চাকরিজীবী, পেশাজীবীদের ঠিকানা হয়ে উঠেছে রাজপথ। সবকিছুর প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে, ব্যবসা-বাণিজ্যে।বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হারসহ নানা কারণে ধুঁকছে অর্থনীতি, ধুঁকছে শিল্প-ব্যবসা-বিনিয়োগ। এক প্রকার নীরব মন্দায় আক্রান্ত দেশ।ব্যবসায় লাভের বদলে এখন চলছে টিকে থাকার সংগ্রাম। যাঁরা পারছেন না, তাঁদের ব্যবসা বা উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।অসংখ্য কারখানা এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, কাজ হারিয়েছেন বিপুলসংখ্যক কর্মী। নতুন বিনিয়োগ না থাকায় নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। দ্রুত বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি হারানোর প্রভাব সরাসরি পড়েছে সরকারের রাজস্ব আয়ে। চলতি অর্থবছরের চার মাসেই রাজস্ব ঘাটতি ১৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।সমস্যাগ্রস্ত করদাতারা ঠিকমতো করও দিতে পারছেন না। সর্বশেষ হিসাবে রিটার্ন জমা দেওয়া করদাতাদের মধ্যে ৮৮ শতাংশই শূন্য রিটার্ন জমা দিয়েছে, অর্থাৎ তারা কোনো কর দেয়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় বেশি ভ্যাট পাওয়ার কথা থাকলেও সেখানেও চলছে খরা। আমদানি শুল্কেও মোটা অঙ্কের ঘাটতি পড়ছে। ফলে সরকারের নিজস্ব আয়ের জায়গাটিও ঝুঁকিতে।
ব্যবসায়ী-অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নতুন অর্ডার দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছেন। আইন-শৃঙ্খলা ও ব্যবসায় পরিবেশের উন্নতি আর রাজনৈতিক সরকার না আসা পর্যন্ত অর্থনীতিতে গতি ফিরবে না। রাজস্ব আদায় চাঙ্গা করতে গেলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে চাঙ্গাভাব ফিরিয়ে আনতে হবে। ভ্যাট বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মানুষের আয় কমে যাওয়ায় ভোগ কমেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো কমিয়েছে উৎপাদন। আগের তুলনায় পণ্যের দাম বাড়লেও বিক্রি কমায় ভ্যাট আদায় কমেছে। অর্থনীতি গতিশীল না হলে রাজস্ব আদায় বাড়বে না।বিশ্লেষকরা মনে করেন, বেসরকারি খাত স্থবির, কোনো বিনিয়োগ নেই। শিল্পের উৎপাদন সংকুচিত। একে একে কারখানা বন্ধ হচ্ছে। উচ্চ সুদে কেউ ব্যবসার প্রসার ঘটাতে চাচ্ছেন না, আবার নতুন কারখানায়ও বিনিয়োগ করছেন না। অর্থাৎ কেনাকাটাই হচ্ছে না ঠিকমতো। সাধারণেরও সীমিত আয়ের বিপরীতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পণ্যের চাহিদা ও ভোগ ব্যয় কমে গেছে, যার ফলে কমছে আমদানি। বিশেষ করে শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানি কমছেই। এ কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু তা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, ‘ঘাটতি মেটানোর জন্য ঋণ নেওয়া ছাড়া সরকারের আর কোনো উপায় নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অথবা ব্যাংকিং খাত থেকে এই ঋণ নিয়েই হয়তো এই ঘাটতি মেটানো হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ছাপিয়ে ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে।’ বিকেএমইএ সহসভাপতি মোহাম্মদ রাশেদ বলেন, ‘আমরা এখন এক কঠিন সময় পার করছি। দেশের সার্বিক অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নতুন অর্ডার দিতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছেন। যদি দ্রুত সমাধান না আসে, এই সংকট আরো গভীর হবে।’প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে হবে। একবার পিছিয়ে গেলে সেখান থেকে নিজেদের অবস্থান টেনে তোলা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি।

