কয়েক বছর ধরেই দেশের অর্থনীতি ধুঁকছে। করোনা মহামারি, যুদ্ধ ও অন্যান্য প্রতিকূল অবস্থা মোকাবেলা করে বেসরকারি খাত আপ্রাণ চেষ্টা করে এ সময়ে অর্থনীতির স্বাভাবিকতা রক্ষা করে আসছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে তাদের মেরুদণ্ড রীতিমতো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। শত শত কারখানা বন্ধ হয়েছে।
নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। লাখ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছে। বেকারত্ব রীতিমতো আকাশ ছুঁয়েছে। বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নেমেছে।এর একটি বড় প্রমাণ বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়া। গতকাল কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এই প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.০৩ শতাংশে, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিম্নহার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানোর কথা বলে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশে উন্নীত করে, কিন্তু বাস্তবে এর কোনোটিই হয়নি।
বরং নীতি সুদহার না কমায় ব্যাংকঋণের সুদহারও কমছে না। ১৬ শতাংশ সুদহারে উদ্যোক্তাদের পক্ষে ব্যাংকঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বারবার নীতি সুদহার কমানোর দাবি জানানো হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ছিলেন এ ব্যাপারে অনমনীয়। ফল যা হওয়ার, তা-ই হয়েছে। বিনিয়োগ গতি হারিয়েছে।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি ব্যাহত হয়েছে। অর্থনীতি বিপদগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরের ৬.১ শতাংশ থেকে জানুয়ারিতে ঋণপ্রবৃদ্ধি আরো কমে হয়েছে ৬.০৩ শতাংশ। অথচ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে অর্থাৎ গণ-অভ্যুত্থানের মাসেও এই হার ছিল ১০.১৩ শতাংশ। আরো একটু আগে এই হার ছিল ১২ শতাংশের মতো। জানুয়ারি-জুন ২০২৬ মেয়াদের মুদ্রানীতি ঘোষণায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, কঠোর মুদ্রানীতি, বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের বাড়তি ঋণ গ্রহণ এবং নতুন বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়াই প্রবৃদ্ধি হ্রাসের প্রধান কারণ।
নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা নেওয়ায় দেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা অনেকটা আশান্বিত। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন হয়েছে। নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়াতে এবং অর্থনীতিতে গতি আনতে নীতিগত সহায়তা দেওয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিনেই তিনি বলেছেন, বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাংক খাতের উচ্চ সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে বন্ধ শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যপ্রতিষ্ঠান চালু করে অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর ওপর জোর দেওয়া হবে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, ঋণের এই নিম্নমুখী প্রবাহের অর্থ দাঁড়ায়, বিনিয়োগ কার্যত ‘ডেড জোনে’। আর বিনিয়োগ ডেড জোনে যাওয়া মানে অর্থনীতির বিপন্ন দশা। বিপন্ন অবস্থা থেকে অর্থনীতিকে টেনে তুলতে হবে। আমরা আশা করি, বর্তমান সরকার অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে দেশে দ্রুত বিনিয়োগ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগী হবে।

