উৎপল মণ্ডল, শ্যামনগর
চলতি মৌসুমে সুন্দরবনের মধু আহরণ মৌসুম শুরু হয়েছে বুধবার (১ এপ্রিল) থেকে। দেশে প্রাকৃতিক মধুর সবচেয়ে বড় উৎস সুন্দরবন থেকে প্রতিবছর এপ্রিল-মে দুই মাস মধু আহরণের অনুমতি পান মৌয়ালরা। তবে চলতি মৌসুমের শুরুতে সামনে এসেছে বনদস্যুদের ভয়ংকর চাঁদাবাজির অভিযোগ। জীবন ও জীবিকার ঝুঁকি এড়াতে বাধ্য হয়ে মৌয়ালদের একটি অংশ দুই মাসের জন্য দস্যুদের সঙ্গে মাথাপিছু ২১ হাজার টাকার ‘চুক্তি’ করে বনে প্রবেশ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্র ও একাধিক মৌয়ালের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বনদস্যু ‘আলিফ ওরফে দয়াল বাহিনী’-কে ৭ হাজার এবং ‘নানাভাই ডন বাহিনী’-কে ৫ হাজার, ‘জোনাব বাহিনী’-কে ৬ হাজার ও দুলাভাই বাহিনী’-কে ৩ হাজার করে মোট ২১ হাজার টাকা পরিশোধের শর্তে মৌয়ালদের বনে পরিবেশ ও নির্দিষ্ট এলাকায় মধু আহরণের ‘নিরাপত্তা’ দেওয়ার দাবিতে অলিখিত চুক্তি হচ্ছে বলে দাবি মৌয়াল ও মৌয়াল মহাজনদের। এ অর্থ পরিশোধ না করলে অপহরণ, মারধর কিংবা মুক্তিপণ দাবির ঝুঁকি থাকছে বলেও দাবি তাদের। মৌয়াল ও তাদের মহাজনদের দাবি, এই চুক্তি অনুযায়ী চাঁদার টাকা সরাসরি বনদস্যদের হাতে না দিয়ে স্থানীয়ভাবে তাদের নির্দিষ্ট সহযোগীদের মাধ্যমে পরিশোধ করা হচ্ছে। এসব সহযোগীরা মৌয়ালদের কাছ থেকে আগাম টাকা সংগ্রহ করে দস্য বাহিনীগুলোর কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়াটি গোপনে পরিচালিত হলেও স্থানীয়ভাবে এটি ‘ওপেন সিক্রেট’ হিসেবে পরিচিত। মৌয়ালদের ভাষ্য, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বনবিভাগ থেকে পাস (অনুমতিপত্র) নেওয়ার পরেও বনের ভিতরে কোন কার্যকর নিরাপত্তা না থাকায় তারা দস্যুদের মুখোমুখি হচ্ছেন। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে আগাম টাকা দিয়ে দস্যুদের সঙ্গে সমঝোতা যাচ্ছেন।সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে মধু আহরণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মৌয়াল বলেন, ‘বনে গেলে ডাকাত যে ধরবেনা এর কোন গ্যারান্টি নেই। তারা ধরে নিয়ে গিয়ে টাকা দাবি করে। শারীরিকভাবে নির্যাতনও করে। সেসময় পরিবারের লোকজনও দুশ্চিন্তায় থাকে। তাই আগে থেকেই টাকা দিয়ে রাখলে অন্তত নিশ্চিন্তে কাজ করা যায়।’ খুলনার গোবরা এলাকার মৌয়াল শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বছরের এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু এখন মধু আহরণ মানেই ভয় নিয়ে বনে যাওয়া। বন বিভাগের অনুমতি থাকলেও বাস্তবে কোন নিরাপত্তা পাই না। ডাকাত দলগুলোকে টাকা না দিলে তারা আমাদের জিম্মি করে। এরপর নির্যাতন তারপর নির্দিষ্ট চুক্তি ছাড়া তিন থেকে চার গুণ টাকা আদায় করে।’ একই এলাকার আরেক মৌয়াল বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট ষ্টেশন থেকে পাস সংগ্রহের সময় আক্ষেপ করে বলেন, ‘সুন্দরবনের ডাকাতদের এই চাঁদাবাজি এখন ওপেন সিক্রেট হয়ে গেছে। সবাই জানে, কিন্তু কেউ মুখ খুলতে চায় না। কারণ বনদস্য বাহিনীগুলো পরে বনে গেলে প্রতিশোধ নিতে পারে এই ভয়ে।’ অগ্রিম বনদস্যুদের চুক্তির টাকা পরিষদের বিষয়ে মৌয়াল মহাজন শরীফ হোসেন বলেন, ‘অন্যান্য বছর আমি ৭ থেকে ১০ টা পর্যন্ত নৌকা প্রস্তুত করে দাদনের মাধ্যমে মৌয়ালদের বনে পাঠাতাম। কিন্তু এবার এখন পর্যন্ত একটি নৌকাও প্রস্তুত করতে পারিনি বনদস্যুদের চাঁদা দাবির কারণে। ইতিমধ্যে চারটি পৃথক দস্যু বাহিনী আমার কাছে চাঁদা দাবি করেছে। তাদের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী টাকা পরিশোধ না করে বনে নৌকা পাঠালে মৌয়ালদের অপহরণের হুমকি দিচ্ছে দস্যুদলগুলো।’ স্থানীয় বনজীবীদের অভিযোগ, এক সময় সরকারি উদ্যোগে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে পুরাতন বাহিনীসহ নতুন নামে বিভিন্ন দস্যু বাহিনী আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এতে করে শুধু জেলে নয় মৌয়ালদের জীবন-জীবিকাও হুমকির মুখে পড়েছে। মধু আহরণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম প্রধান সুন্দরবনে দস্যুতা প্রসঙ্গে বলেন, ‘সুন্দরবনের জলদস্যু-বনদস্যু আমাদের আশপাশেই রয়েছে। সবাই সচেতন হয়ে সাহসের সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে এবং সঠিক তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করলে দস্যুতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। আপনারা যখন দেখছেন আপনার ভাই বা চাচা বনদস্যু, তখন তার বিরুদ্ধে কথা বলছেন না, শুধু প্রশাসনের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। শুধু প্রশাসনকে দোষারোপ না করে নিজেদের মধ্যে থেকেই দস্যুদের চিহ্নিত করতে হবে। তাহলে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হবে।

