উত্তম চক্রবর্তী, রাজগঞ্জ
ভোরবেলা থেকেই শুরু হয় জালাল উদ্দিনের কর্মযজ্ঞ। রোদ কিংবা হাড়কাঁপানো শীত কোনো কিছুই দমেন না তিনি। বলছিলাম যশোরের মনিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জের সংবাদপত্র বিক্রেতা জালাল উদ্দিনের কথা। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে রাজগঞ্জের মানুষের দোরগোড়ায় খবর পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। জালাল উদ্দিনের বাড়ি রাজগঞ্জের হানুয়ার গ্রামে। তার ঘরে রয়েছে দুইটি কন্যা সন্তান। তিনি ডিগ্রি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান জালাল। প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষ করেই তিনি চলে আসেন রাজগঞ্জ বাজারের বাসস্ট্যান্ডে। অপেক্ষা করেন যশোর থেকে ছেড়ে আসা বাসের জন্য। বাস এলে পত্রিকা নামিয়ে একে একে প্যাকেট খুলে তা সাজিয়ে নেন বাইসাইকেলের ঝুঁড়ির ভিতর। এরপর শুরু হয় তার মূল কর্মব্যস্ততা। সকাল সাতটা বাজতে না বাজতেই গ্রাহকদের ফোনের ভিড় জমে। পত্রিকা কখন আসবে? এমন সব প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতেই তিনি সাইকেল চালিয়ে ছুটে চলেন রাজগঞ্জ বাজারের বিভিন্ন অফিস, দোকান ও বাসা বাড়িতে। কখনো পায়ে হেঁটে আবার কখনো সাইকেল চালিয়ে তিনি পত্রিকা বিলি করেন সারা রাজগঞ্জ বাজারে। পত্রিকা শিল্পের বর্তমান নাজুক অবস্থার কথা তুলে ধরে স্থানীয় পত্রিকা এজেন্ট অনু দত্ত জানান, এক সময় পত্রিকা বিক্রি হতো প্রচুর। কিন্তু এখন অনলাইনের প্রভাবে মানুষ মুঠোফোনেই খবর পড়ে নেয়। ফলে আগের তুলনায় গ্রাহক অনেক কমে গেছে। একদিকে বিক্রি কম, অন্যদিকে আমাদের কমিশনও এখন অনেক নগণ্য। ফলে এই পেশার সাথে জড়িতদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। রাজগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি এসএম রবিউল ইসলাম বলেন, জালালের মতো সংবাদপত্রের হকাররা মূলত আমাদের সংবাদ শিল্পের প্রাণভোমরা। রোদ-বৃষ্টি বা কনকনে শীত উপেক্ষা করে প্রতিদিন মানুষের দুয়ারে খবর পৌঁছে দেওয়া এক অন্যরকম লড়াই। আধুনিক প্রযুক্তির দাপটে পত্রিকা পড়ার অভ্যাস কমলেও জালালদের গুরুত্ব কমেনি। রাজগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ জসিম উদ্দিন বলেন, দ্রব্যমূল্যের এই ঊর্ধ্বগতির বাজারে তার সামান্য লাভে জীবন চালানো সত্যিই কষ্টসাধ্য। এই পেশার মানুষদের প্রতি সমাজের বিত্তবান ও প্রশাসনের সুদৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তাদের এই নিরলস সেবা অব্যাহত থাকে। এই পেশায় টিকে থাকাটা এখন জালাল উদ্দিনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। চার সদস্যের সংসার চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। মাস শেষে যে সামান্য টাকা আয় হয়, তাতেই কোনোমতে দিন পার করেন তিনি। তবুও সংবাদপত্রের প্রতি এক গভীর ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা থেকে তিনি এই কাজ আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। অন্যান্য পেশার মানুষেরা ঈদে বোনাস বা বাড়তি আয়ের সুযোগ পেলেও জালালদের কপালে তা জোটে না। পত্রিকা বিলি করে যাদের জ্ঞানপিপাসা মেটান, তাদের কাছ থেকে ঈদ সালামি বা বিশেষ কোনো সহযোগিতাও তেমন একটা মেলে না তার। তবুও তার কোনো অভিযোগ নেই, হাসিমুখেই বিলিয়ে যান প্রতিদিনের টাটকা খবর।

