অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশের আইন-শৃঙ্খলা প্রায় ভেঙে পড়েছিল। মব সন্ত্রাস হয়ে উঠেছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। আর এই মব সন্ত্রাসের কারণে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। যাঁদের আমরা ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ বলে সম্মানিত করি সেই শিক্ষক সমাজ সবচেয়ে জঘন্য হামলার শিকার হয়।
গতকাল প্রকাশিত একগুচ্ছ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সেই ন্যক্কারজনক পরিস্থিতির নানা দিক উঠে এসেছে। উঠে এসেছে এসব ঘটনার ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের নিস্পৃহ মনোভাব এবং প্রতিকারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ার দুর্ভাগ্যজনক চিত্র। জানা যায়, মব সন্ত্রাসে শারীরিক ও মানসিক আঘাতের কারণে ছয়জন শিক্ষকের মৃত্যু হয়েছে। আহত ও অসুস্থ হয়ে পাঁচ শতাধিক শিক্ষক দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন।
কেউ হাসপাতালে আছেন। আবার কেউ কেউ মিথ্যা মামলায় জেলহাজতেও আছেন। অনুসন্ধানে পাওয়া যায় পাঁচ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও। যাতে ফুটে উঠেছে মব সন্ত্রাসের ভয়াবহ চিত্র।
ঘটনাটি ২০২৪ সালের ১৮ আগস্টের। সেদিন বরিশালের গৌরনদীতে থাকা ‘মাহিলাড়া এএন মাধ্যমিক বিদ্যালয়’-এর স্টাফ কোয়ার্টারে প্রধান শিক্ষক প্রণয় কান্তি অধিকারীর বাসায় হামলা করে শতাধিক ব্যক্তি। বিপন্ন হয়ে পড়েন পরিবারসহ প্রধান শিক্ষক। প্রণয় কান্তির মেয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আদৃতা অধিকারী ফেসবুক লাইভে সেই দৃশ্য দেখানো শুরু করলে এক পর্যায়ে সেনাবাহিনী গিয়ে উদ্ধার করে আক্রান্ত পরিবারটিকে। সে যাত্রায় প্রাণে বাঁচলেও পরে জোর করে পদত্যাগ করানো হয় প্রধান শিক্ষক প্রণয় অধিকারীকে।
প্রণয় কান্তি অধিকারীর মতো এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন দেশের বেসরকারি বিদ্যালয়ের অন্তত তিন হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকা। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষকও মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি চর দখলের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখলে নামে। তারা দুর্নীতির অভিযোগ তুলে, স্বৈরাচারের দোসর তকমা দিয়ে নিরপরাধ শিক্ষকদের অপমান-অপদস্থ করে, শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন চালায়। তারা এ কাজে স্থানীয় কিছু লোক, এমনকি কিছু শিক্ষার্থীকেও ব্যবহার করে। জোর করে পদত্যাগপত্রে সই করিয়ে নেওয়া হয়, তারপর লাঞ্ছিত করে তাঁদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঠিক কতজন শিক্ষক মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন সুনির্দিষ্টভাবে সে সংখ্যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর বা জেলা শিক্ষা অফিসের কাছে পাওয়া যায়নি। মবের শিকার হওয়া শিক্ষকদের সংগঠন ‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’-এর তথ্য মতে, ৫ আগস্টের পর মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষক।
মব সন্ত্রাসে পদত্যাগ করানো ঢাকার ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী বলেন, ‘২০২৪ সালের ১১ আগস্ট যে আমাদের জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজে তার স্পষ্ট প্রমাণ আছে।’ তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয় থেকে আমাকে পুনর্বহালের চিঠি দিয়েছে। কিন্তু তার পরও স্কুল থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি দুই বছর ধরে আমার বেতন বন্ধ।’
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধূরী বলেন, এই মব সন্ত্রাসের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার তো কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারেনি। এখন অন্তত নির্বাচিত সরকার এসেছে, তারা ব্যবস্থা নেবে, সেটাই আশা করছি। মব সন্ত্রাসের ঘটনা এখনো ঘটছে। এই ভয়ংকর প্রবণতা রোধ করতে হবে। এ পর্যন্ত সংঘটিত মবের প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি মবের শিকার শিক্ষকদের সবার সম্মানজনক পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

