২৩শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

সুন্দরবনে দস্যুতায় ফিরছেন আত্মসমর্পণকারীরা

কামরুজ্জামান মুকুল, বাগেরহাট
সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণার কয়েক বছর পেরোতেই সংরক্ষিত এই বনাঞ্চলে আবারও উঁকি দিচ্ছে দস্যুতার কালো ছায়া। ২০১৮ সালে ঘটা করে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা কয়েকশ বনদস্যুর জীবন এখন মামলার খরচ আর পুনর্বাসনের অভাবে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া এবং কর্মসংস্থানের সংকটে ‘দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া’ অনেক আত্মসমর্পণকারী আবারও পুরোনো অন্ধকার পথে পা বাড়াচ্ছেন বলে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ৩২টি বাহিনীর ৩২৮ জন দস্যু অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অঙ্গীকার করেছিলেন। সরকার তখন সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করে তাদের পুনর্বাসনের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ আত্মসমর্পণকারীরা। রামপাল উপজেলার সাবেক দস্যু সর্দার সাব্বির শেখ থেকে শুরু করে কামাল শিকারী বা সোলাইমান—সবার কণ্ঠেই একই হাহাকার। তাদের দাবি, তিন মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির কথা থাকলেও বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরতে গিয়ে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। দৈনিক উপার্জনের বড় অংশই চলে যাচ্ছে আইনি লড়াইয়ে, ফলে সংসার চালানোই এখন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার শ্রীফলতলা এলাকার পঞ্চাশোর্ধ্ব সাব্বির শেখ জানান, ‘একসময় তিনি জুলফিকার বাহিনীর নেতৃত্বে দিয়েছিলেন। ১৬ বছর ধরে সুন্দরবনের বুকে দস্যুতা করে বেড়িয়েছেন তিনি। ২০১৮ সালে আত্মসমর্পণ করে ফিরে আসেন স্বাভাবিক জীবনে। তবে নতুন জীবনও দিন দিন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে বলে দাবি করেন সাব্বির শেখ।’ এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মামলা উঠিয়ে নেবে, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে, এমন বিভিন্ন আশ্বাসে আমরা আত্মসমর্পণ করি। কিন্তু এখনও আমার তিনটি মামলা রয়েছে। আর যে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছে সেটাও পর্যাপ্ত নয়। মামলার খরচ ও চিকিৎসা খরচ মেটাতে বাপের জায়গাটুকুও বিক্রি করছি। এখন আমাদের একমাত্র সমস্যা হলো ক্ষুধা। তিন বেলা খেতে পারি না। তিনবেলা খেতে না পারলেও সুখে আছি। তবে মামলার চাপ আর ক্ষুধার যন্ত্রণায় আত্মসমর্পণকারী অনেক বনদস্যু আবারও সুন্দরবনে যাচ্ছে।’ সংশ্লিষ্টজনরা বলছেন, আত্মসমর্পণকারী জেলেদের সরকারের সব ধরনের সহযোগিতা ও পুনর্বাসনে নানামুখী পদক্ষেপের আশ্বাস দিলেও কার্যকর তেমন কিছুই দেখা যায়নি। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল পুনর্বাসন ও মামলার চাপে অনেকেই ফিরছেন পুরানো পেশায়। একই দাবি আত্মসমর্পণকারীদেরও।
কোস্টগার্ডের তথ্যমতে, গত দেড় বছরে সুন্দরবনে অভিযান চালিয়ে করিম-শরীফ, নানা ভাই, ছোট সুমন, আলিফ ও আসাবুর বাহিনীসহ বিভিন্ন বিভিন্ন নতুন ও পুরোনো বাহিনীর ৬১ জন সদস্যকে আটক করা হয়েছে, যার মধ্যে আত্মসমর্পণকারীদের উপস্থিতিও পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে বনের গভীরে ৮ থেকে ১০টি দলে প্রায় শতাধিক দস্যু সক্রিয় রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
সংস্থাটি জানায়, বর্তমানে কোস্টগার্ড ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শীল্ড’ ও ‘অপারেশন রিস্টোর পিস’-এর মাধ্যমে জিরো টলারেন্স নীতিতে অভিযান চালানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে ৮০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৯৯ রাউন্ড তাজা গোলাবারুদসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার এবং ৭৮ জন জেলে ও ৩ জন পর্যটককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
কোস্টগার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় বনদস্যুদের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। এ প্রেক্ষিতে আমরা বিভিন্ন সময় যৌথ অভিযান পরিচালনা করছি। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা ও জেলে, বাওয়ালিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কোস্টগার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।’ বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, ‘২০১৮ সালে আত্মসমর্পণকারী বনদস্যুদের প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছিল। যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে, তারা যদি আমাদের নিকট কোনো আবেদন করে তাহলে আমরা তাদের দাবি-দাওয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করতে পারি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যেভাবে সিদ্ধান্ত নেবে, সে অনুযায়ী তাদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, অনেক বনদস্যু আত্মসমর্পণ করার জন্য আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে। আমরা এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছি না। কারণ একজন অন্যায় করবে আর রাষ্ট্র বারবার তাকে সুযোগ দেবে, বিষয়টা ঠিক না। বনদস্যুরা যে অপরাধ করছে তাদের হয়ত সেখান থেকে সরে আসতে হবে, না হয় আমাদের যে অভিযান তাদের তা মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছি। প্রতিনিয়ত অভিযান চলছে। আমরা প্রয়োজনে কৌশল পরিবর্তন করে তাদের গ্রেফতার করার ব্যবস্থা করব। যেকোনো মূল্যে আমরা সুন্দরবনকে দস্যু মুক্ত করব। যাতে উপকূলের সাধারণ মানুষ তাদের জীবন জীবিকার জন্য সুন্দরবনে যেতে পারে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়