মোস্তফা হোসেইন
’৭২-এর সংবিধানের কবর রচনার কথা বলেছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির দক্ষিণাঞ্চলীয় সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে দেওয়া তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে। হাসনাত আব্দুল্লাহর দলের একাধিক নেতাও এমন বক্তব্য দিয়েছেন। এবার জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান বললেন, ‘মানুষের আইনের কবর রচনা করে দেশে পবিত্র কোরআনের আইন প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ তাঁর এই দাবির পাশাপাশি তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন—‘আমি চ্যালেঞ্জ দিলাম, জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতা বলেছে, আমার কাছে জান্নাতের টিকিট আছে, বিক্রি করছি? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে জবাব দিতে হবে, কেন তিনি এটা বলছেন।’
হাসনাত আব্দুল্লাহ শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলেছিলেন, যে শহীদ মিনারের পথ বেয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল এবং যে মুক্তিযুদ্ধের অর্জন ’৭২-এর সংবিধান। আর জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান যে সংসদে দাঁড়িয়ে মানব রচিত আইনের কবর রচনার কথা বলেছেন, সেটিও মানব রচিত আইন তথা সংবিধানের সূত্রেই প্রতিষ্ঠিত এবং এই সংসদ জাতীয় পবিত্র স্থান।
সংসদে দাঁড়িয়ে বৃহস্পতিবার এই সংসদ সদস্য আবারও বললেন, ‘আমরা কোরআনের আইন চাই।’ কিভাবে কোরআনের আইন প্রণীত হবে, তারও একটা সূত্র তিনি উল্লেখ করেছেন তাঁর বক্তৃতায়। বুধবার সংসদ সদস্যের এই বক্তব্য প্রচারের পর থেকে জামায়াতে ইসলামীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে আবারও আলোচনা শুরু হয়েছে। একইভাবে তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও আচরণও বিশ্লেষণ হচ্ছে। তিনি মানুষের আইনের কবর রচনা করার কথা বলেছেন। প্রশ্ন আসে, তিনি যে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই আইনটাও মানুষের তৈরি। তাঁর কথা অনুযায়ী মানুষের তৈরি আইনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের বৈধতা থাকে কি? দ্বিতীয়ত, তাঁর দল জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতিহারে কি মানুষের তৈরি আইনের কবর রচনার কথা বলেছে? এমনকি নির্বাচনের আগে তারা স্পষ্টত বলেছে—জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবে না। এবং এটা জামায়াতের দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় সারির কোনো নেতার বক্তব্য নয়। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের কথা।
মাত্র মাস তিনেক আগে, জানুয়ারি মাসের ১৬ তারিখ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একটি প্রতিনিধি দল জামায়াতে ইসলামীর আমিরের সঙ্গে দেখা করতে গেলে ন্যাশনাল খ্রিস্টান ফেলোশিপ অব বাংলাদেশের জেনারেল সেক্রেটারি মার্থা দাসকে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এমন কথা বলে আশ্বস্ত করেছেন। (বিবিসি নিউজ বাংলা, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬)
ধর্ম সম্পর্কে আমার ধারণা কম, তাই ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিতে পারব না। কিন্তু একজন সাধারণ মুসলমান হিসেবে এটুকু বুঝি, শরিয়া আইন কোরআনের আলোকেই হওয়ার কথা। মার্থা দাস যখন সাংবাদিকদের সামনে জামায়াতের আমিরের বক্তব্যের কথা বলেছিলেন, তখন মার্থা দাসের পাশে ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তিনি মার্থা দাসের বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করেন, ‘অনেকে জিজ্ঞেস করেন যে, শরিয়া আইন না অমুক মডেলে তমুক মডেলে? ফলে আমিরে জামায়াত বলেছেন, বাংলাদেশে যে বিদ্যমান আইন, সে আইনেই বাংলাদেশ চলবে, যেখানে সব ধর্মের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা হবে। এবং এই আইনটিই যথেষ্ট এখন।’
সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসে, জামায়াতে ইসলামী আসলে কোনটা চায়? মানব রচিত আইনকে কবর দেওয়ার এই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর আমিরের বক্তব্যের মিল খুঁজে পাওয়া যায় কি? জামায়াতের আমির বলেছেন, বিদ্যমান আইনের ভিত্তিই থাকবে। অথচ তাঁরই দলের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান বলেন, আমরা কোরআনের আইন চাই। আপনারা (বিএনপি) আল্লাহর আইনের বিরোধিতা করবেন না বলেছেন, আসুন বাংলাদেশে মানুষের আইনের কবর রচনা করে কোরআনের আইন প্রতিষ্ঠা করি।’
সংসদে দাঁড়িয়ে কোনো এমপি কি তাঁর দলের নীতির বিরুদ্ধে যায় এমন বক্তব্য দিতে পারেন? তাহলে প্রশ্ন আসে, জামায়াতে ইসলামীর দলীয় সিদ্ধান্ত কোনটা। সাধারণ জ্ঞানে ধরে নিতে হবে, জামায়াতে ইসলামীর আমির যদি কোনো কথা বলেন, একই দলের অন্য কোনো সদস্য তাকেই সমর্থন করবেন। কিন্তু মুজিবুর রহমান সাহেব আমিরের বক্তব্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, তাই নয় কি? যদি দলীয় প্রধানের বিপরীত বক্তব্য দেওয়ার কারণে জামায়াতে ইসলামী উক্ত সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তখন তাঁর বক্তব্যকে জামায়াত অস্বীকার করেছে বলে মনে করতে হবে। আর যদি জামায়াতে ইসলামী সংসদে এর কোনো ব্যাখ্যা না দেয়, তাহলে কি মনে হবে না, মুজিবুর রহমানের বক্তব্যই জামায়াতে ইসলামীর বক্তব্য? তখন প্রশ্ন আসবে, তাহলে জামায়াতে ইসলামীর আমির যা বলেছেন, তার কি হবে?
মুজিবুর রহমান সাহেব প্রধানমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন যে, জামায়াতে ইসলামীর কোনো নেতা বেহেশতের টিকিটের কথা বলেছেন, তিনি যেন বলে দেন। জনাব মুজিবুর রহমানের চ্যালেঞ্জের জবাব বাংলাদেশের পত্রিকাগুলো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ দিলেই পাওয়া যাবে। বোধ করি এর জন্য প্রধানমন্ত্রীকে কিছু বলতে হবে না। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, গত ৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেন, জান্নাত অবধারিত।’ লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এবং লক্ষ্মীপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির এ আর হাফিজ উল্যাহ বলেছেন, ‘আপনারা যদি ইসলামের পক্ষে, পবিত্র কোরআনের পক্ষে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেন, আপনারা কী কী কারণে সওয়াবের ভাগি হবেন—এই দেওয়ার কারণে, আপনারা আল্লাহর পক্ষে দিয়েছেন, পবিত্র কোরআনের পক্ষে দিয়েছেন; আপনাদের জন্য জান্নাত অবধারিত। আর আমি বলি, যারা পবিত্র কোরআনের বিরুদ্ধে ভোট দেবে, তারা গুনাহগার হবে।’
কোরআনের বিরুদ্ধে কারা ভোট প্রার্থী হয়েছেন, এমন তথ্য তিনি না দিলেও কথায় অনুমান করা যায়, দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী কোরআনের পক্ষে এবং বাকিরা বিপক্ষে। এই বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়—তার বক্তব্য হচ্ছে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে বেহেশত অবধারিত। এক্ষেত্রে কেউ যদি বলে জামায়াতে ইসলামীর দাবি, তাদের কাছে বেহেশতের চাবি আছে, তাহলে কি ভুল বলা হবে?
লক্ষ্মীপুরের হাফিজ উল্যাহ সাহেবের চেয়ে অনেক বেশি আলোড়ন তৈরি করেছিল কুষ্টিয়া আসনের জামায়াত মনোনীত ও নির্বাচনে বিজয়ী এমপি মুফতী আমির হামজার একটি বক্তব্য। ৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল—‘জামায়াতকে ভোট দিলে বেহেশত নিশ্চিত’, আমির হামজার বক্তব্য নিয়ে যা বললেন শিশির মনির।’
ভারতীয় অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানাকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর তিনি বলেছিলেন, ১৬ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসিন হলে আজান দিতে দেওয়া হয় না। এগুলো আবার তিনি ওয়াজ মাহফিলে হরহামেশাই দিয়েছেন। নির্বাচনী জনসভায় দিলেও বলা যেত নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য।
না, এমন বলার সুযোগ নেই যে, শুধু মুফতী আমির হামজাই এমন কথা বলেছেন। আর সেটা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতেই খারাপ লেগেছে। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য মোহাম্মদ শিশির মনির মুফতী আমির হামজার বক্তব্য সম্পর্কে একটি টকশোতে বলেছেন, ‘তার (আমির হামজা) আগের বক্তব্যের জন্য তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। … জামায়াতকে ভোট দিলে কেউ বেহেশতে চলে যাবে, আরেকজনকে ভোট দিলে কেউ বেহেশতের বাইরে চলে যাবে—এই প্রপাগান্ডাটা আই ডোন্ট থিংক ইটস গুড।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ৭ অক্টোবর ২০২৫)।
তার মানে হচ্ছে, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা মোহাম্মদ শিশির মনিরের মুখ থেকে আমির হামজা যে বেহেশত নিশ্চিত বলেছেন, তার স্বীকারোক্তি পাওয়া গেল।
নির্বাচনী প্রচার চলাকালে জামায়াতে ইসলামীর নারী কর্মীরাও একইভাবে ধর্মের কথা বলে নারী ভোটারদের আকৃষ্ট করার সংবাদ ওই সময় ব্যাপক প্রচার পেয়েছিল। সুতরাং জনাব মুজিবুর রহমান যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, তার জবাব প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত যাওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। পত্রিকাগুলো স্পষ্ট জবাব দিচ্ছে—জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন স্থানে বলেছে, দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে বেহেশত পাওয়া যাবে। যা রাজনৈতিক ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে ‘বেহেশতের চাবি’ হিসেবে।জনাব মুজিবুর রহমান দেশে ইসলামী আইন চালু করার জন্য একটি ইসলামী বোর্ড গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনেরও প্রস্তাব করেছেন। তাঁর এই প্রস্তাব কি স্ববিরোধিতা নয়?
তিনি বলেছেন, ‘মাদ্রাসা থেকে পাস করা সংসদ সদস্য এবং সংসদ সদস্যের বাইরে যত মাযহাবের আলেম আছেন, তাঁদের নিয়ে এই বোর্ড গঠন করার।’ এবার আসা যাক, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের কতজন মাদ্রাসা থেকে পাস করে আসা। বোর্ড গঠন করতে গেলে প্রথম দফাতেই যে তাদের আমিরকে বাদ দিতে হবে, কারণ তিনি মাদ্রাসা শিক্ষিত নন।
তিনি তাঁর বক্তব্যে বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ বাস্তবায়ন করা হোক। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সঙ্গে জুলাই সনদের প্রসঙ্গ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। প্রশ্ন আসে, তিনি যে কোরআনের আইন রচনার কথা বলেছেন, কোরআনের আইন প্রণয়নের কোনো কথা কি জুলাই সনদে আছে? রাজনৈতিক দলগুলো কি কোরআনের আইন প্রণয়নের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে?
যে জুলাই সনদের বিষয়ে তারা এত সোচ্চার, সেই জুলাই সনদের পরিপন্থী দাবি কি তিনি করলেন না? আর সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন হলে কি তারা জুলাই সনদের বাইরে গিয়ে কোরআনের আইন প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন? এটাও কি তাঁর দাবির সঙ্গে স্ববিরোধিতা নয়?
এবার দেখা যাক, জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে আলেম সমাজ কী বলেন। চরমোনাইর পীর সাহেব নির্বাচনের আগে বলেছেন, ‘আমরা নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছি। জামায়াতসহ অন্যান্য দলও ইশতেহার প্রকাশ করেছে। ইশতেহারে আমরা পরিষ্কারভাবে বলেছি, শরিয়তকে প্রাধান্য দিয়ে দেশ পরিচালনা করা হবে। জামায়াত কিন্তু কোথাও ইসলামের কথা বলেনি। এরপরও কেউ যদি জামায়াতকে ইসলামি দল বলে, আমি বলব, তারা বোকার স্বর্গে বসবাস করে।’ (বাংলা ট্রিবিউন, ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা মহিবুল্লাহ বাবুনগরী বলেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামী প্রকৃত ইসলামি দল নয়। প্রকৃত ইসলামকে তারা ধারণ করে না। তারা মদিনার ইসলাম নয়, মওদুদী ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়।’ (দেশ রূপান্তর, ১২ জুলাই ২০২৫)
যে দলটির ইসলাম বিশ্বাস নিয়ে আলেম-ওলামাদেরই এমন মত, সেখানে তাদের দ্বারা কোরআনের আইন প্রতিষ্ঠা কি প্রশ্নাতীত?
সংসদে কথা বলার সুযোগ শুধুমাত্র সংসদ সদস্যদের। কিন্তু তাদের কথা, দাবি-দাওয়াগুলো সাধারণ মানুষের কানে আসে, চোখে পড়ে। তাই তাদের কাছ থেকে এমন বক্তব্যই প্রত্যাশিত, যা জনগণের চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে গ্রহণযোগ্য।সাধারণ মানুষ প্রতিটি দল ও প্রত্যেক নেতার রাজনৈতিক আদর্শ এবং তাদের রাজনৈতিক আচরণ লক্ষ্য করে। সেই বিষয়টিও নিশ্চয়ই তারা স্মরণে রাখবেন, যাতে মানুষের আস্থায় ঘাটতি না হয়।
লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।

