দেশের অর্থনীতির চাকা ঠিকমতো চলছে না। নতুন বিনিয়োগ নেই। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি। শিল্প ও কৃষি উভয় খাতই ধুঁকছে।অপরিহার্য নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে স্কুল-কলেজের ফি, চিকিৎসা ব্যয়, যাতায়াত ভাড়াসহ সামগ্রিক জীবনযাত্রার খরচ। মানুষের আয় না বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে অনেক। জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। তারা ভবিষ্যতের জন্য রাখা সামান্য সঞ্চয় ভেঙে নিত্যদিনের খরচা মেটাচ্ছে।প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, একটি দেশের অর্থনীতিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির গুরুত্ব অপরিসীম। তারাই দেশের অর্থনীতিকে মজবুত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে সহায়তা করে। নিয়মিত কর দেয়, সঞ্চয় করে, আবার নতুন নতুন পণ্য ক্রয়ের মধ্য দিয়ে বাজারে চাহিদাও তৈরি করে।এ কারণে দেখা যায়, বিভিন্ন দেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে বাংলাদেশে মধ্যবিত্তদের জন্য এখন পর্যন্ত এ ধরনের সুরক্ষাবলয় নেই, বরং প্রতিবছর বাজেটে মধ্যবিত্তের ওপর করের বোঝা ভারী করা হয়।বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের মোট সংখ্যা সুনির্দিষ্ট না হলেও এই সংখ্যা তিন কোটির নিচে নয়, যা মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ২০ শতাংশ। বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর ২০ লাখ লোক নতুন করে মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংকটের বড় কারণ নির্দিষ্ট আয়। তার পরও নির্দিষ্ট মাসিক আয় থেকে বাঁচিয়ে অল্প হলেও সঞ্চয়ের মানসিকতা থাকে তাদের। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তাই বিপদ-আপদে ভরসার সঞ্চয়ও আর ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত ছয় মাসে সঞ্চয়পত্র ভাঙার পরিমাণ ৩২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের এক-তৃতীয়াংশ পরিবার এখন ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে, ২০২২ সালে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক গড় আয় ছিল ৪৫ হাজার ৫৭৮ টাকা, সেটি এখন প্রকৃত অঙ্কে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকায়।
অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ মনে করেন, দেশের অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধির পূর্বশর্ত হলো মধ্যবিত্তের হাতে বাড়তি অর্থের প্রবাহ রাখা। বাজারে চাহিদা তৈরি ও নতুন পণ্যসেবার প্রসারে মধ্যবিত্ত শ্রেণি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব কারণে বিভিন্ন দেশের সরকার নীতিনির্ধারণে মধ্যবিত্তের হাতে তুলনামূলক বেশি অর্থ রাখার বিষয়ে সচেতন থাকে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ বলেছেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে উদীয়মান মধ্যবিত্তই দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। কাজেই আমাদেরও উচিত দেশের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য বিশেষ সুরক্ষাবলয় তৈরি করা।’
আর কয়েক দিন পর আসছে নতুন বাজেট। এটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট। আমরা আশা করছি, এই সরকার দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সুরক্ষায় বিশেষ নজর দেবে। দীর্ঘ মেয়াদে কাঠামোগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে। এ লক্ষ্যে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, করছাড়, স্বাস্থ্য বীমায় সরকারি ভর্তুকি, স্বল্প সুদে আবাসন ঋণসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

