একটু ভালো করে বাঁচার আশায়, একটু বেশি উপার্জনের জন্য অনেকে বিদেশে যেতে চান, প্রয়োজনে অবৈধ পথে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যায়। আর তাদেরই টার্গেট করে থাকে মানব পাচারকারী চক্র। প্রথমে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে-ভালিয়ে রাজি করিয়ে নিজেদের কবজায় নেয় বিশেষ চক্র।
একবার ওই চক্রের খপ্পরে পড়লে আর রক্ষা নেই। জিম্মি করে নির্যাতন করা হয় মুক্তিপণের জন্য। মুক্তিপণ দিয়েও অনেকের জীবন রক্ষা হয় না। অনেকের মাঝসাগরে করুণ মৃত্যু হয়।অনুসন্ধানে কক্সবাজার-টেকনাফে মানব পাচারকারী বিশাল চক্রের এমনই পৈশাচিক চিত্র উঠে এসেছে।প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কক্সবাজার-টেকনাফের গহিন জঙ্গলে মানব পাচারকারীরা গড়ে তুলেছে আস্তানা। মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বহু শিশু-নারী-পুরুষকে প্রথম সেই আস্তানায় রাখা হয়। একসময় ট্রলারে করে শুরু হয় সাগরে যাত্রা।
এর পরই শুরু হয় নির্মম নির্যাতন। এ রকম একটি ট্রলার গত ৪ এপ্রিল কক্সবাজারের বাহারছড়া থেকে যাত্রা শুরু করে। এতে পাচারচক্রের ১৩ জনসহ মোট আরোহী ছিলেন ২৭৩ জন। শতাধিক বাংলাদেশি, বাকিরা কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গা। চার দিন পর মাঝসাগরে প্রতারকচক্রের সঙ্গে জিম্মিদের মারামারি-হট্টগোলের এক পর্যায়ে ট্রলারটি ডুবে যায়।করুণ পরিণতি ঘটে ২৬৪ জনের। ৯ জন দীর্ঘ ৩৬ ঘণ্টা সাগরে ভেসে থাকার পর কপালগুণে বেঁচে যান। জানা গেছে, কাছ দিয়েই যাচ্ছিল চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যাওয়া ইন্দোনেশিয়াগামী একটি জাহাজ, সেই জাহাজের ক্যাপ্টেনের আন্তরিক তৎপরতায় বেঁচে যান এই ৯ জন।
বেঁচে যাওয়াদের মধ্যে একজন রোহিঙ্গা যুবক রফিক। তাঁর কাছ থেকে ভয়াবহ নির্যাতনের তথ্য জানতে পেরেছে কালের কণ্ঠ। এ ছাড়া কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানী টিম সাগরপথে মানবপাচারের তথ্য উদঘাটনে মালয়েশিয়াও সফর করে। এতে যেসব তথ্য উঠে এসেছে, তা এককথায় ভয়াবহ। জানা গেছে, কক্সবাজার ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় রয়েছে বিশাল প্রতারকচক্র। এদের হাতে অনেক পর্যটকও অপহরণের শিকার হয়েছেন। এরা প্রথমে দালালের কাছে প্রতিজনকে ৫০ হাজারে বিক্রি করে। মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য যে ট্রলার ব্যবহার করা হয়, সেটি কোনো যাত্রীবাহী নৌযান নয়, নিছক মাছ ধরার ট্রলার। ভেতরে কেউ দম বন্ধ হয়ে মারা গেলে তৎক্ষণাৎ লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। সব শেষে মালয়েশিয়ায় পৌঁছার পরও চলে নির্যাতন। জিম্মি করে পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়। কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে তাঁদের মেলে মুক্তি।
বাংলাদেশ জনবহুল দেশ। জনশক্তি রপ্তানি আমাদের বিদেশি মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস। কাজেই বৈধ উপায়ে বিদেশে প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারলে দেশের জন্যই ভালো। এ ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা দূর করা প্রয়োজন। যাঁরা বিদেশে যেতে ইচ্ছুক, তাঁরা যেন সহজেই বৈধ পথে বিদেশে যেতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা দরকার। বৈধ পথ সহজ হলে অনেকেই অবৈধ পথে পা বাড়াবেন না।
মানবপাচার রোধে দেশে আইন রয়েছে, সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ দরকার। মানব পাচারকারীদের এমন জঘন্য তৎপরতা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। পরিস্থিতি উন্নয়নে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কড়া নজরদারি প্রয়োজন।

