ড. রাধেশ্যাম সরকার
বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারায় নির্মাণখাত একটি অপরিহার্য বাস্তবতা। শহর থেকে গ্রাম, সড়ক থেকে আবাসন, সর্বত্রই নির্মাণের চাহিদা বাড়ছে। আর এই নির্মাণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ইটভাটা শিল্প। কিন্তু এই শিল্প আজ এমন এক জটিল সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে, যেখানে একদিকে রয়েছে পরিবেশ ধ্বংসের নির্মম চিত্র, অন্যদিকে লাখো শ্রমিকের জীবিকার প্রশ্ন। ফলে ইটভাটা নিয়ে আলোচনাটি কেবল পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক নয়, এটি গভীরভাবে সামাজিক ও মানবিক এক বাস্তবতার প্রতিফলন। বর্তমান সরকার পরিবেশ সুরক্ষায় দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান জোরদার করেছে, যার সাম্প্রতিক চিত্রই এই সংকটের গভীরতা ও প্রশাসনিক সক্রিয়তাকে একসঙ্গে তুলে ধরে। গত নভেম্বর থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত মাত্র চার মাসে পরিচালিত অভিযানে ১১টি অবৈধ ইটভাটা সম্পূর্ণভাবে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা আইন প্রয়োগে কঠোরতার একটি স্পষ্ট নিদর্শন। একই সঙ্গে ১ জানুয়ারি থেকে অদ্যাবধি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১৫টি মামলা দায়ের এবং ৩০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে, যা নিয়মিত নজরদারি ও তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রতিফলন। বিশেষ করে ধলেশ্বরী নদীর দুই পাড়ে গড়ে ওঠা দূষণকারী ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের আলাদা উদ্যোগ পরিস্থিতির গুরুত্বকে আরও জোরালোভাবে নির্দেশ করে। জানুয়ারি ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত সেখানে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ৩৬টি ইটভাটায় অভিযান চালানো হয়েছে, যার মধ্যে ৮টি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং ৬৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান কেবল প্রশাসনিক তৎপরতার চিত্রই তুলে ধরে না, বরং এটিও স্পষ্ট করে যে, সমস্যার বিস্তৃতি এতটাই গভীর যে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, বরং একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো ইটভাটার ক্ষতিকর প্রভাবকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে, যা আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয় বরং একটি ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ। একাধিক স্থানে দেখা গেছে, ইটভাটার বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে বিস্তীর্ণ ফসলি জমির ধান পুড়ে নষ্ট হয়ে গেছে, যেখানে কয়েকশ একর জমি এবং বিপুলসংখ্যক কৃষক সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা প্রতিবাদে সমবেত হয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন, যা তাদের অসহায়ত্ব ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। একই ধরনের আরেকটি ঘটনায় দেখা গেছে, একটি ইটভাটার নির্গত ধোঁয়া ও গ্যাসের প্রভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে এবং বহু কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে, ইটভাটা এখন কেবল বায়ু দূষণের উৎস হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সরাসরি কৃষি উৎপাদন, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং খাদ্য নিরাপত্তার ওপর গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আইনগত কাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশে ইটভাটা নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট বিধান রয়েছে। ২০১৩ সালে প্রণীত ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন এবং ২০১৮ সালের সংশোধনীতে লাইসেন্স ছাড়া ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কৃষি জমি, পাহাড় বা টিলা থেকে মাটি সংগ্রহ করে ইট তৈরির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এমনকি জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করাও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। আবাসিক এলাকা, বনভূমি, জলাভূমি কিংবা পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় ইটভাটা স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব বিধান লঙ্ঘন করলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা থাকায় এই আইনগুলোর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ইটভাটার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজারের কাছাকাছি, যার প্রায় অর্ধেকই অবৈধ। ২০২৩ সালের জাতীয় সংসদের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৭ হাজার ৮৮১টি ইটভাটার মধ্যে ৪ হাজার ৬৩৩টি অবৈধ ছিল। এই বিপুলসংখ্যক অবৈধ ইটভাটা শুধু পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ৩০৯টি ইটভাটা ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং ১১১ জনকে সাজা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই অভিযানের ফলে প্রায় ৬ লাখ শ্রমিক তাদের কাজ হারিয়েছেন, যা একটি নতুন সামাজিক সংকট সৃষ্টি করেছে।ইটভাটা সমস্যা কোনো একমুখী বাস্তবতা নয়। এটি পরিবেশ, অর্থনীতি ও সমাজের এক জটিল আন্তঃসম্পর্কের প্রতিফলন। তাই এর সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। অবৈধ ইটভাটা বন্ধের পাশাপাশি বিকল্প প্রযুক্তির প্রসার, শ্রমিকদের পুনর্বাসন এবং কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল একটি টেকসই ও ভারসাম্যপূর্ণ পথ নির্মাণ সম্ভব হবে। তখনই হয়তো আমরা এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোতে পারব, যেখানে উন্নয়ন, পরিবেশ এবং মানবিকতার মধ্যে একটি সুষ্ঠু সমন্বয় প্রতিষ্ঠিত হবে।
ইটভাটা শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর কাঁচামাল ও জ্বালানি নির্ভরতা। ইট তৈরির জন্য বিপুল পরিমাণ মাটি প্রয়োজন হয়, যা মূলত ফসলি জমির ওপরের উর্বর স্তর থেকে সংগ্রহ করা হয়। এই স্তরেই মাটির প্রধান পুষ্টি উপাদান থাকে, যা ফসল উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য। কৃষকেরা অনেক সময় তাৎক্ষণিক আর্থিক লাভের আশায় এই মাটি বিক্রি করে দেন, ফলে দীর্ঘমেয়াদে তাদের জমির উর্বরতা নষ্ট হয়। পাশাপাশি বহু ইটভাটায় এখনো সনাতন পদ্ধতিতে কাঠ পুড়িয়ে ইট তৈরি করা হয়, যার ফলে ব্যাপক হারে বন উজাড় হচ্ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠে, ইটভাটা বন্ধই কি একমাত্র সমাধান? পরিবেশের স্বার্থে অবৈধ ও দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ করা অবশ্যই জরুরি, কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের জীবিকার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দেশে প্রায় ২৫ লাখ শ্রমিক ইটভাটায় কাজ করেন। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে হঠাৎ করে কর্মহীন করে দিলে তা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তাই সমাধান হতে হবে সমন্বিত এবং টেকসই। এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কংক্রিট ব্লক বা ব্লক ইট তৈরিতে মাটি পোড়ানোর প্রয়োজন হয় না, ফলে বায়ু দূষণ কমে যায় এবং কৃষিজমির ওপর চাপও হ্রাস পায়। ইটভাটা শ্রমিকদের এই প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ প্রদান করা গেলে তারা সহজেই নতুন কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারবেন। একইসঙ্গে ইটভাটা মালিকদেরও ব্লক ইট উৎপাদনে উৎসাহিত করা প্রয়োজন, যাতে তারা তাদের বিনিয়োগ ধরে রাখতে পারেন এবং নতুন বাজার তৈরি হয়।
পরিশেষে বলা যায়, ইটভাটা সমস্যা কোনো একমুখী বাস্তবতা নয়। এটি পরিবেশ, অর্থনীতি ও সমাজের এক জটিল আন্তঃসম্পর্কের প্রতিফলন। তাই এর সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক। অবৈধ ইটভাটা বন্ধের পাশাপাশি বিকল্প প্রযুক্তির প্রসার, শ্রমিকদের পুনর্বাসন এবং কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল একটি টেকসই ও ভারসাম্যপূর্ণ পথ নির্মাণ সম্ভব হবে। তখনই হয়তো আমরা এমন এক বাস্তবতার দিকে এগোতে পারব, যেখানে উন্নয়ন, পরিবেশ এবং মানবিকতার মধ্যে একটি সুষ্ঠু সমন্বয় প্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখক: সিনিয়র কৃষিবিদ, কলামিস্ট ও চেয়ারম্যান

