১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

‘পানির নিচে’ নিউমার্কেট, জনদুর্ভোগের সঙ্গে ব্যবসাতেও ভাটা

প্রতিদিনের ডেস্ক:
সোমবার, মধ্যদুপুর। ঢাকার আজিমপুর পুরাতন কবরস্থানের সামনে প্রচণ্ড যানজট। প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো সামনে এগোচ্ছে না। কয়েকজন পথচারীকে উচ্চস্বরে চিৎকার করে থেমে থাকা যানবাহনগুলোকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার তাড়া দিতে দেখা যায়। কিন্তু তাতেও অবস্থা তথৈবচ।
পথচারীদের থামাতে মুরুব্বি গোছের একজন এগিয়ে এসে জানান, বৃষ্টিতে রাস্তা তলিয়ে আছে। কয়েকটি প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে আটকে আছে। তাই যানবাহনের চালকরা সামনে যাবেন কি যাবেন না, সেই সিদ্ধান্তহীনতায় সেখানে থমকে দাঁড়িয়ে আছেন।
সোমবার দুপুরের আগে মুষলধারে বৃষ্টিতে রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা নিউমার্কেটের প্রধান ফটকের সামনের রাস্তা তলিয়ে গিয়ে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়।
দুয়ারে কড়া নাড়ছে কোরবানির ঈদ। ব্যবসায়ীরা আশায় ছিলেন, শেষ মুহূর্তের টুকটাক বেচাকেনায় কিছুটা হলেও লোকসান পুষিয়ে নেবেন। কিন্তু এক বেলার বৃষ্টিতে সে আশায় অনেকটাই গুড়ে বালি পড়েছে।এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ব্যবসায়ীরা বলেন, এমনিতেই এবার ঈদে বেচাকেনা মন্দা। তার ওপর এই অকাল জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় পুরো দিনের ব্যবসাটাই লাটে উঠেছে। ক্রেতা আসা তো দূরের কথা, দোকানের মালপত্র বাঁচানোই এখন দায়।সরেজমিনে দেখা গেছে, টানা ভারী বৃষ্টির কারণে নিউমার্কেট এলাকা ছাড়িয়ে নীলক্ষেত থেকে আজিমপুর কবরস্থান অভিমুখী সড়কটি এখন যেন এক চিলতে নদীতে পরিণত হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও ঈদযাত্রায় নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি।আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আজ সোমবার (২৫ মে) দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে শুধু ঢাকায়ই ৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে তাকে ভারী বৃষ্টিপাত ধরা হয়। সে হিসাবে আজ রাজধানীতে বেশ ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ১৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছিল বলে জানায় অধিদপ্তর।জলাবদ্ধতার কারণে নীলক্ষেত থেকে আজিমপুর কবরস্থান অভিমুখী সড়ক দিয়ে চলাচলকারী প্রাইভেটকার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা এবং মোটরসাইকেল আরোহীদের চরম বিপাকে পড়তে দেখা যায়। নোংরা পানি ঠেলে চলতে গিয়ে হঠাৎ করেই যানবাহনের ইঞ্জিন মাঝ রাস্তায় বন্ধ হয়ে যেতেও দেখা যায়। নিউমার্কেটের বিপরীত দিকের রাস্তায় একটি প্রাইভেটকার অসহায় দাঁড়িয়ে ছিল প্রায় ডুবন্ত অবস্থায়।এই চরম দুর্ভোগের মাঝেও একশ্রেণির মানুষের উপার্জনের পথ তৈরি হয়েছে। রাস্তায় পানি জমে থাকায় সাধারণ পথচারীদের পারাপারের জন্য এগিয়ে এসেছেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালকরা। জনপ্রতি ১০ টাকার বিনিময়ে তারা সাধারণ মানুষকে এই কৃত্রিম নদী ‘পারাপার’ করে দিচ্ছেন।ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার জন্য আজিমপুর কবরস্থানের সামনে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন পোশাককর্মী রহিম মিয়া। পরনে তার ঈদের নতুন পোশাক। আলাপকালে তিনি আক্ষেপ করে জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে ভালো কাপড়-চোপড় পরে আনন্দের সঙ্গে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলাম। কিন্তু এসে দেখি চারদিকে পানি থৈ থৈ করছে। নোংরা পানির ছিটায় নতুন কাপড় নষ্ট হওয়ার উপক্রম। এই জলাবদ্ধতা দেখে মনটাই খারাপ হয়ে গেছে।’আজিমপুর নতুন পল্টন এলাকার নজরুল ইসলাম নামে ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিভিন্ন সরকারের সময় প্রতি বছর জলাবদ্ধতা নিরসনে রাস্তা খুঁড়ে মোটা মোটা পাইপ বসানো হলেও সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা ডুবে যায়, পানি নিষ্কাশন হয় না।’তিনি বলেন, ‘চীনের দুঃখ হোয়াংহো নদী আর নিউমার্কেট এলাকার আশেপাশের বাসিন্দাদের দুঃখ একটুখানি বৃষ্টিতেই এখানকার জলাবদ্ধতা।’জলাবদ্ধতায় ভোগান্তিতে পড়া সেসব এলাকার অনেকে এই প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেন, এক বেলার বৃষ্টিতেই যেখানে রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকা স্থবির হয়ে পড়ে, সেখানে নগরবাসীর প্রশ্ন—বছরের পর বছর ধরে চলা ড্রেনেজ ব্যবস্থার এসব সংস্কার প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা আসলে কোথায় গেল? এর স্থায়ী সমাধান কবে হবে, তা এখনো অন্ধকারেই রয়ে গেছে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়