নিজস্ব প্রতিবেদক
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম চামড়ার মোকাম যশোরের রাজারহাটে শনিবার (৩০ মে) ছিল ঈদ পরবর্তী প্রথম হাট। তবে এদিন চামড়ার ব্যবসায় ধ্বস পড়েছিল। ব্যবসায়ীরা পানির দামে চামড়া বিক্রি করে পুঁজি হারিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। হাটে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তারা চামড়ার কাঙ্খিত দাম পাননি। আর পাইকারদের দাবি, তারা মান অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত দামেই চামড়া কিনেছেন। যশোরের রাজারহাট দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বড় চামড়ার হাট। যশোরসহ খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ছাড়াও গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা, ঈশ্বরদী ও নাটোরের ব্যবসায়ীরা এখানে চামড়া বেচাকেনা করতে আসেন। পবিত্র ঈদুল আজহার পর শনিবার এখানে ছিল প্রথম হাট। ঈদ পরবর্তী প্রথম হাটে এখানে কোটি কোটি টাকার চামড়া হাতবদল হলেও এবারই প্রথম হাটের চিত্র ছিল ভিন্ন। দূর-দূরান্ত থেকে চামড়া নিয়ে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলেছেন, এবারের হাটে এসে তারা চামড়ার কাঙ্খিত দাম পাননি। মান ও আকারভেদে গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ১৫০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত। আর ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে প্রতি পিস মাত্র ১০ থেকে ২০ টাকায়। ফলে চামড়া কেনা, লবণ দেয়া ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে তারা লাভ তো দূরের কথা পুঁজি হারিয়েছেন। মৌসুমি ব্যবসায়ী অনেকেই ঋণ নিয়ে চামড়া কিনে এখন বিপাকে পড়েছেন। বাগেরহাটের চামড়া ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন বলেন, প্রায় একশ’ কিলোমিটার দূর থেকে চামড়া নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখানে ক্রেতা নেই বললেই চলে। গরুর চামড়া প্রতি পিস ১৫০ থেকে ২৫০ টাকার বেশি বলা হচ্ছে না। এতে তার সবই লোকসান হচ্ছে। বাইরের কোনো ক্রেতা না থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে চামড়া পানির দামে বিক্রি হচ্ছে। বাড়িতে আরও চামড়া পড়ে আছে, পরের হাটে আনব কি না, সেটিও বুঝতে পারছি না। লবণ, শ্রমিকের মজুরি ও যাতায়াত খরচ মিলিয়ে কোনোভাবেই তিনি লাভের মুখ দেখছেন না। যশোরের বাঘারপাড়ার ব্যবসায়ী নারায়ণ শীল বলেন, সরকার গরুর চামড়ার মূল্য ৫৭ থেকে ৬২ টাকা ফুট নির্ধারণ করলেও বাজারে ৪০ টাকা ফুটেও বেচাকেনা হয়নি। আর ছাগলের চামড়ার তো কোনো দামই নেই। ১২টি ছাগলের চামড়া বিক্রি করেছি মাত্র ১২০ টাকায়। তিনি বলেন, গ্রাম থেকে ৫০০ টাকা করে গরুর চামড়া কিনেছি। প্রতি চামড়ায় ১০০ টাকা করে লবণের খরচ হয়েছে। অথচ হাটে এসে সেই চামড়া বিক্রি করতে হয়েছে ৬০০ টাকা দরে। তাহলে যাতায়াত খরচই লোকসানে পরিণত হয়েছে। ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ২০ টাকায়। ফলে গাড়ি ভাড়া ও নিজের শ্রমের মূল্য ধরলে সবই লোকসান। নড়াইলের ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন বলেন, ৩৭৫ পিস চামড়া নিয়ে রাজারহাটে এসেছিলাম। সবচেয়ে ভালো চামড়াটি বিক্রি হয়েছে ৯০০ টাকায়। বাকি চামড়াগুলো পানির দামে বিক্রি করতে হয়েছে। ঋণ নিয়ে ব্যবসা করি এবং বাড়িতে আরও ৪৫০ পিস চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে রেখেছি। সামনের হাটে আনব। তবে দাম কম থাকলে ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। অবশ্য বিক্রেতাদের এসব অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি পাইকারি ক্রেতারা। তাদের বলেছেন, ভালোমানের চামড়া সরকার নির্ধারিত দামেই কেনা হয়েছে। অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী অভিজ্ঞতার অভাবে কাটা, ছেঁড়া বা রোগাক্রান্ত নিম্নমানের চামড়া কিনে আনছেন, যার কারণে তারা লোকসানের মুখে পড়ছেন। হাটের পাইকার আব্দুল হান্নান বলেন, শনিবারের বাজারে ভালো ও খারাপ-দুই ধরনের চামড়াই এসেছে। ভালো চামড়া ভালো দামেই বিক্রি হয়েছে। তিনি নিজে সর্বোচ্চ ৯০০ টাকায় একটি চামড়া কিনেছেন। ফুট হিসেবে হিসাব করলে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও বেশি দাম দেয়া হয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, ভালো মানের চামড়াগুলো এখনও বাজারে আসেনি। সামনের হাটে আরও ভালো চামড়া আসবে এবং বিক্রেতারা ভালো দাম পাবেন। আড়তদার হাসিব চৌধুরী বলেন, এদিনের বাজার মোটামুটি ভালো এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের কাছাকাছি দামে চামড়া বেচাকেনা হয়েছে। যারা লোকসানের কথা বলছেন, তারা মূলত মৌসুমি ব্যবসায়ী। অভিজ্ঞতার অভাবে তারা কম দামের চামড়া বেশি দামে কেনেন এবং সঠিকভাবে লবণও দিতে পারেন না। ফলে বাজারে এসে প্রত্যাশিত দাম পান না। তিনি আরও বলেন, চামড়ার দাম নির্ভর করে তার মানের ওপর। ভালো চামড়ার দাম বেশি, খারাপ চামড়ার দাম কম। এদিনের বাজারে নি¤œমানের চামড়া বেশি এসেছে। তবুও প্রায় সব চামড়াই বিক্রি হয়ে গেছে। সামনে আরও কয়েকটি হাট রয়েছে, তখন বাজার আরও ভালো হবে। অপর আড়তদার আলাউদ্দিন মুকুল বলেন, ঈদের পর বেশিরভাগ ব্যবসায়ী চামড়ায় লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করেছেন। প্রথম হাটে অনেকে বাজার পরিস্থিতি দেখতে কিছু চামড়া এনেছেন। আগামী মঙ্গলবার ও শনিবারের হাটে চামড়ার আমদানি বাড়বে। এদিন ভালো মানের চামড়া ভালো দামেই বিক্রি হয়েছে। পাশাপাশি লবণ ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় চামড়া সংরক্ষণের খরচও বেড়েছে। এ খাতকে রক্ষা করতে সরকারের আরও আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন। হাটের ইজারাদার রাজু আহমেদ বলেন, ঈদ পরবর্তী প্রথম হাট হিসেবে চামড়ার আমদানি কিছুটা কম হয়েছে। ঈদের পর চামড়া সংগ্রহ, লবণ দেয়া এবং সংরক্ষণের উপযোগী হতে কয়েকদিন সময় লাগে। তাই অনেক ব্যবসায়ী এখনও চামড়ার গাঁট ভাঙেননি। হয়ত আগামী হাটে চামড়ার আমদানি বাড়বে এবং বাইরের ক্রেতারাও আসবেন। তখন বাজার পুরোপুরি জমে উঠবে। হাট ইজারাদারের তথ্য অনুযায়ী, আজকের হাটে প্রায় দশ হাজার চামড়া উঠেছে। আগামী হাটগুলোতে সঠিক তদারকি ও চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ক্ষতি কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

