২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের গৌরব ও বৈশ্বিক স্বীকৃতি

এ এইচ এম ফারুক
একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত ও সদ্য স্বাধীন দেশ থেকে আজ বিশ্বমঞ্চে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রধানতম কাণ্ডারি হয়ে ওঠার গল্পটি অদম্য আত্মত্যাগ, কঠোর পেশাদারিত্ব এবং কূটনৈতিক দূরদর্শিতার এক অনন্য মহাকাব্য। ১৯৭১ সালে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ আজ বিশ্বব্যাপী ‘শান্তির দূত’ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। আর এই অনন্য অর্জনের নেপথ্যে রয়েছে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে আমাদের সশস্ত্র (সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী) এবং পুলিশ বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা।
সম্প্রতি (২০২৬ সালের মে মাসের শেষভাগে) ‘আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস’ উপলক্ষে শান্তিরক্ষা মিশনে কর্তব্যরত অবস্থায় জীবন উৎসর্গকারী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক-বেসামরিক বীর সন্তানদের মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করেছে জাতিসংঘ। এবার মরণোত্তর মর্যাদাপূর্ণ ‘দ্যাগ হ্যামারশোল্ড মেডেল’-এ ভূষিত হয়েছেন বাংলাদেশের ৬ জন বীর শান্তিরক্ষী, যা নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক গাম্ভীর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হচ্ছে। এই বৈশ্বিক সম্মাননা আমাদের জাতীয় হৃদয়ে যেমন গভীর বেদনার সঞ্চার করে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের কূটনীতি, অর্থনীতি ও মর্যাদাকে নিয়ে গেছে এক অনন্য আন্তর্জাতিক উচ্চতায়।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন কেবল একটি অ্যাসাইনমেন্ট বা দ্বিপাক্ষিক দায়িত্ব নয়; এটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ এক বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির যুদ্ধক্ষেত্র। যেখানে জাতিগত দাঙ্গা, গৃহযুদ্ধ ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর বুলেটের সামনে বুক পেতে দিতে হয়। ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক গ্রুপে (UNIIMOG) মাত্র ১৫ জন সেনা কর্মকর্তা পাঠানোর মধ্য দিয়ে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, আজ তা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ‘ট্রুপ কন্ট্রিবিউটিং কান্ট্রি’ হিসেবে রূপ নিয়েছে। বিগত সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে আফ্রিকার তপ্ত মরুভূমি থেকে শুরু করে হাইতির দুর্গম জনপদ—সবখানেই ব্লু হেলমেট মাথায় দিয়ে শান্তির সুবাতাস ছড়িয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের বীর সন্তানেরা।কিন্তু এই গৌরবের পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার এই মহান ব্রত পালন করতে গিয়ে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের বহু বীর সন্তান নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ, অতর্কিত সন্ত্রাসী হামলা কিংবা প্রাণঘাতী রোগব্যাধির মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তাঁরা পেশাদারিত্বের এক চুল বিচ্যুতি ঘটতে দেননি। সম্প্রতি যে ৬ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীকে জাতিসংঘ মরণোত্তর পদকে ভূষিত করেছে, তাঁদের এই সর্বোচ্চ আত্মত্যাগই প্রমাণ করে যে বৈশ্বিক শান্তি ও মানবিকতার প্রশ্নে বাংলাদেশ কতটা আপসহীন। এই রক্তে লেখা গৌরবগাঁথাই আজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশকে বিশ্বস্ততার শীর্ষ সোপানে উন্নীত করেছে।
শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের এই ধারাবাহিক এবং অনন্য অবদান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আমাদের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে বহুগুণ শক্তিশালী করেছে। বৈশ্বিক যেকোনো নীতিনির্ধারণী ফোরামে, বিশেষ করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে বাংলাদেশের মতামতকে অত্যন্ত সমীহের সাথে মূল্যায়ন করা হয়। সিয়েরা লিওন, কঙ্গো, দক্ষিণ সুদান, লেবানন কিংবা মালির মতো যুদ্ধবিক্ষুব্ধ দেশের সাধারণ মানুষের কাছে আজ বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা এক একটি আস্থার প্রতীক। সিয়েরা লিওনে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের অবদান এতটাই গভীর ছিল যে, কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তারা বাংলা ভাষাকে তাদের অন্যতম ‘অফিসিয়াল ভাষা’র মর্যাদা দিয়েছিল, যা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল ও অভূতপূর্ব ঘটনা।
জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে বিশ্বনেতারা বিভিন্ন সময়ে বিশ্বশান্তিতে বাংলাদেশের এই নিঃস্বার্থ ও অকুতোভয় ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এই বৈশ্বিক স্বীকৃতি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সফট পাওয়ার বা কূটনৈতিক প্রভাবকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং কৌশলগত সহযোগিতা পাওয়ার পথকে অনেক সহজ ও মসৃণ করে তোলে।
জাতিসংঘের এই শান্তিরক্ষা মিশন কেবল দেশের ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক মর্যাদাই বৃদ্ধি করছে না, বরং বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এক বিশাল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত আমাদের বাহিনীগুলোর হাজার হাজার সদস্য প্রতি বছর যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে পাঠান, তা সরাসরি আমাদের জাতীয় রেমিট্যান্সে যুক্ত হচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে, যখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, তখন শান্তিরক্ষীদের মাধ্যমে অর্জিত এই রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতিকে এক বড় ধরনের ব্যাকআপ বা সুরক্ষা দিচ্ছে।
এখানেই শেষ নয়, মিশনে ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর নিজস্ব আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, লজিস্টিকস ও ভারি কন্টিনজেন্ট সরবরাহ করা হয়। এর বিপরীতে জাতিসংঘ থেকে বাংলাদেশ সরকার বড় অংকের ক্ষতিপূরণ ও লভ্যাংশ পেয়ে থাকে। এই তহবিল আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা বাজেট এবং সামরিক সক্ষমতা পরোক্ষভাবে বৃদ্ধিতে বিশাল অবদান রাখছে। ফলে এই মিশন যুগপৎভাবে দেশের মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বয়ংসম্পূর্ণতার এক অনন্য মডেল।
এই উচ্চতর অভিজ্ঞতা, কৌশলগত জ্ঞান ও দক্ষতা যখন আমাদের জওয়ানেরা দেশে ফিরে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন, তখন তা দেশের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও সুসংহত করে। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো ভূ-রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল, জটিল সীমান্ত নিরাপত্তা সুরক্ষা এবং দেশের যেকোনো অভ্যন্তরীণ ক্রান্তিলগ্নে আমাদের বাহিনীর এই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও পরিপক্বতা অত্যন্ত কার্যকর ও পেশাদার ভূমিকা রাখতে সহায়তা করছে।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের এই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আমাদের জাতীয় ঐক্যের এক অনন্য স্মারক। রাজনৈতিক বা সামাজিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে এই একটি জায়গায় পুরো বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে এক এবং অনন্য। ৬ জন বীর শান্তিরক্ষীকে জাতিসংঘের এই মরণোত্তর সম্মাননা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বশান্তির বেদিতে আমাদের আত্মত্যাগের গভীরতা কতখানি।
তবে এই গৌরব ধরে রাখতে হলে আমাদের ভবিষ্যৎ রোডম্যাপ আরও সুনির্দিষ্ট করতে হবে। বর্তমান সরকারের দূরদর্শী কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ে, বিশেষ করে মিশনগুলোর ‘ফোর্স কম্যান্ডার’ বা নীতিনির্ধারণী শীর্ষ পদগুলোতে যেন বাংলাদেশি যোগ্য কর্মকর্তারা আরও বেশি সুযোগ পান, সেই প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে। একই সাথে পরিবর্তিত ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধক্ষেত্রের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের শান্তিরক্ষীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি ও সাইবার সিকিউরিটি সংক্রান্ত উন্নত প্রশিক্ষণে আরও দক্ষ করে তুলতে হবে। বীর শহিদদের রক্তে অর্জিত এই গৌরবময় যাত্রা অব্যাহত থাকুক, বিশ্বশান্তির সুবাতাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা আরও সুদৃঢ় হোক—আজকের দিনে এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
লেখক: এ এইচ এম ফারুক (A H M Faruk)

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়