২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

পরিবেশ দিবসের অঙ্গীকার: পৃথিবী বাঁচানোর শেষ সতর্কসংকেত

ড. হারুন রশীদ
ঢাকার এক শিশু সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালা খুলতেই নির্মল বাতাস নয়, ধোঁয়া আর ধুলোর গন্ধ পায়। স্কুলে যাওয়ার পথে তার কানে বাজতে থাকে অবিরাম হর্নের শব্দ। রাস্তার পাশে জমে থাকা প্লাস্টিকের স্তূপ, কালো পানির খাল আর বিষাক্ত ধোঁয়ায় ঢাকা আকাশ—এটাই যেন তার স্বাভাবিক পৃথিবী। অথচ পৃথিবী এমন হওয়ার কথা ছিল না। প্রকৃতি মানুষের আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা ছিল, মানুষের আক্রমণের শিকার নয়।
প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়। ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের মানব পরিবেশ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৭৪ সাল থেকে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে বৈশ্বিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং সরকার, প্রতিষ্ঠান ও জনগণকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করা। আজ অর্ধশতাব্দী পরে এসে দিবসটির গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়েছে। কারণ, পরিবেশ সংকট এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমানের কঠিন বাস্তবতা।
এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য—‘প্রকৃতি দ্বারা অনুপ্রাণিত: জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।’ প্রতিপাদ্যটি কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি বর্তমান বিশ্বের পরিবেশ ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রকৃতিকেই প্রধান সহায় হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান। বন, নদী, জলাভূমি, সমুদ্র ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা সম্ভব নয়—এই উপলব্ধিকেই এবারের প্রতিপাদ্যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রকৃতি ধ্বংস করে উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না; বরং প্রকৃতিনির্ভর পরিকল্পনাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ পৃথিবী গঠনের অন্যতম শর্ত।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রতিপাদ্যের তাৎপর্য আরও গভীর। কারণ, আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন পরিবেশ ধ্বংসের প্রভাব মানুষের প্রতিদিনের জীবনে সরাসরি আঘাত হানছে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, নদীদূষণ, প্লাস্টিক দূষণ, বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন—সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন এক নীরব আর্তনাদ করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক সংকটগুলোর একটি হলো বায়ুদূষণ। বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার নাম প্রায়ই শীর্ষের দিকে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে রাজধানীর বাতাস যেন ধুলোর চাদরে ঢেকে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, বায়ুদূষণ মানুষের ফুসফুস, হৃদ্‌যন্ত্র ও মস্তিষ্কের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। শিশুদের শ্বাসকষ্ট, বয়স্কদের হৃদ্‌রোগ এবং নানা জটিল রোগ বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে।
এই দূষণের প্রধান উৎস ইটভাটা, পুরোনো যানবাহনের কালো ধোঁয়া, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ এবং শিল্পকারখানার নির্গমন। রাজধানীর চারপাশে গড়ে ওঠা অসংখ্য অবৈধ ইটভাটা কেবল বাতাসই দূষিত করছে না; কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্যও ধ্বংস করছে। উন্নয়নের নামে নির্মাণযজ্ঞ চললেও পরিবেশগত মানদণ্ড অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
শব্দদূষণও এখন এক নীরব মহামারি। ঢাকার সড়কে অবিরাম হর্ন, উচ্চ শব্দে মাইক ব্যবহার, নির্মাণকাজের শব্দ—এসব মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি শব্দদূষণ অনিদ্রা, উদ্বেগ, উচ্চ রক্তচাপ এমনকি শ্রবণক্ষমতা হ্রাসের কারণ হতে পারে। অথচ এই দূষণকে আমরা প্রায়ই “স্বাভাবিক নগরজীবন” বলে মেনে নিই।
প্লাস্টিক দূষণ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। বাংলাদেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, যার বড় অংশই অপরিকল্পিতভাবে পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে। রাজধানীর খাল, ড্রেন ও নদীগুলো পলিথিন ও প্লাস্টিকে ভরে যাচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ এই প্লাস্টিক বর্জ্য। নদীতে ফেলা প্লাস্টিক শেষ পর্যন্ত মাছের শরীরে প্রবেশ করছে, আর সেই মাছ মানুষের খাদ্যতালিকায় ফিরে আসছে। অর্থাৎ মানুষ নিজের তৈরি দূষণ নিজেই ভোগ করছে।নদীদূষণ বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় সংকট। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা কিংবা কর্ণফুলীর মতো নদীগুলো শিল্পবর্জ্য ও পয়োনিষ্কাশনের কারণে মারাত্মকভাবে দূষিত। নদী কেবল পানির উৎস নয়; এটি একটি দেশের অর্থনীতি, কৃষি, সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্যের প্রাণ। নদী মরে গেলে সমাজও ধীরে ধীরে প্রাণশক্তি হারায়।পরিবেশ সংকটের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও লবণাক্ততা ইতোমধ্যে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকাকে বিপন্ন করেছে। উপকূলীয় অঞ্চলের বহু মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হচ্ছে। অথচ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান খুবই সামান্য। তবু ভুক্তভোগীদের তালিকায় আমরা সামনের সারিতে।
বিশ্বের অনেক দেশ পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সুইডেন বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থায় এমন দক্ষতা অর্জন করেছে যে তারা বিদেশ থেকে বর্জ্য আমদানি পর্যন্ত করে। জার্মানি কঠোর রিসাইক্লিং নীতির মাধ্যমে প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনায় সফলতা দেখিয়েছে। নেদারল্যান্ডস নগর পরিকল্পনায় সাইকেলবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে কার্বন নিঃসরণ কমিয়েছে। সিঙ্গাপুর কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন নগর ব্যবস্থাপনার উদাহরণ স্থাপন করেছে। আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডা পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গঠনে বিশ্বব্যাপী প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বাংলাদেশেও উদ্যোগ একেবারে নেই তা নয়। সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ আইন করেছে, পলিথিন নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালিয়েছে। আদালত নদী দখল ও দূষণ রোধে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাও দিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা বাস্তবায়নে। আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল; পরিকল্পনা আছে, কিন্তু ধারাবাহিকতা নেই; সচেতনতার কথা বলা হয়, কিন্তু আচরণে পরিবর্তন খুব কম।
পরিবেশ রক্ষাকে কেবল সরকারের দায়িত্ব মনে করলে ভুল হবে। এটি নাগরিক দায়িত্বও। একজন মানুষ যদি অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক ব্যবহার কমান, রাস্তা বা খালে ময়লা না ফেলেন, অযথা হর্ন না বাজান, পানি ও বিদ্যুতের অপচয় কমান, অন্তত একটি গাছ লাগান—তাহলেও পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। পৃথিবীর বহু বড় সামাজিক পরিবর্তন শুরু হয়েছে ছোট ছোট নাগরিক উদ্যোগ থেকে।
তবে ব্যক্তি সচেতনতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নীতিগত পরিবর্তন জরুরি। প্রথমত, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, গণপরিবহনব্যবস্থা আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে, যাতে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমে। তৃতীয়ত, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। চতুর্থত, শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধনাগার বাধ্যতামূলকভাবে চালু রাখতে হবে এবং আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে নগর পরিকল্পনায় সবুজায়ন বাড়াতে হবে। প্রতিটি শহরে উন্মুক্ত পার্ক, জলাধার ও সবুজ অঞ্চল সংরক্ষণ জরুরি। বনভূমি ধ্বংস করে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে। উন্নয়ন ও পরিবেশকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। টেকসই উন্নয়ন মানেই এমন উন্নয়ন, যা বর্তমানের প্রয়োজন মেটাবে কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনকে বিপন্ন করবে না।
শিক্ষাব্যবস্থায়ও পরিবেশ শিক্ষাকে আরও বাস্তবমুখী করা প্রয়োজন। শিশুদের কেবল বইয়ে পরিবেশের সংজ্ঞা শেখালে হবে না; প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। স্কুলে বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমকে পাঠ্যক্রমের অংশ করা যেতে পারে। গণমাধ্যমও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, তথ্যচিত্র ও জনসচেতনতামূলক প্রচারণা মানুষের মধ্যে পরিবেশ সম্পর্কে নতুন উপলব্ধি সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস তাই কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আত্মসমালোচনার দিন। আমরা কীভাবে প্রকৃতির সঙ্গে আচরণ করছি, কী ধরনের পৃথিবী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছি—সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার দিন। আজ যদি আমরা সতর্ক না হই, তাহলে আগামী দিনের শিশুরা হয়তো বইয়ে সবুজ বন, স্বচ্ছ নদী কিংবা নির্মল আকাশের ছবি দেখবে, বাস্তবে নয়।
পৃথিবী মানুষের সম্পত্তি নয়; মানুষ পৃথিবীর একটি অংশ মাত্র। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষ কখনো নিরাপদ থাকতে পারে না। পরিবেশ রক্ষা তাই বিলাসিতা নয়, অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। এই সংগ্রামে সরকার, প্রতিষ্ঠান, নাগরিক—সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, শেষ পর্যন্ত প্রকৃতি বাঁচলে তবেই মানুষ বাঁচবে; পরিবেশ রক্ষা পেলে তবেই নিরাপদ হবে আমাদের ভবিষ্যৎ।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়