২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

রাজনৈতিক সংস্কৃতি: মতের ভিন্নতা নাকি বিভাজন?

ড. হারুন রশীদ
‘আমি তোমার কথার সঙ্গে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য আমি মৃত্যুতেও প্রস্তুত।’ দার্শনিক ভলতেয়ারের এই উক্তি গণতান্ত্রিক চর্চার মৌলিক ভিত্তিকে স্মরণ করিয়ে দেয়—ভিন্ন মতকে সহ্য করার ক্ষমতাই একটি সভ্য সমাজের পরিচয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এই সহনশীলতা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—আমরা কি সত্যিই ভিন্নমতকে গণতন্ত্রের শক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে শিখেছি, নাকি সেটি ধীরে ধীরে বিভাজনের অস্ত্রে পরিণত হয়েছে? গণতন্ত্রের প্রাণ হচ্ছে বহুমত, সহনশীলতা এবং যুক্তির ভিত্তিতে মতবিনিময়। কিন্তু যখন এই বহুমত সহাবস্থানের জায়গা হারিয়ে ফেলে, তখন তা আর শক্তি থাকে না; বরং হয়ে ওঠে সংঘাত ও অস্থিরতার উৎস। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা এই দ্বৈততারই এক জটিল প্রতিচ্ছবি।
স্বাধীনতার পর থেকে দেশের রাজনীতি নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। গণতান্ত্রিক চর্চা যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক মেরুকরণও ক্রমে গভীর হয়েছে। এই মেরুকরণ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে মতপার্থক্য আর কেবল মতের ভিন্নতা নয়; এটি হয়ে উঠছে পরিচয়ের একটি কঠোর সীমারেখা। ফলে রাজনৈতিক বিরোধিতা অনেক ক্ষেত্রেই আদর্শ বা নীতির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা রূপ নেয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত বৈরিতায়।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাস্তব চিত্র বোঝার জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা একসাথে বিবেচনা করলে একটি স্পষ্ট ধারা চোখে পড়ে—মতের ভিন্নতা ক্রমেই বিভাজনের দিকে ঝুঁকছে।
প্রথমত, নির্বাচনকে ঘিরে আস্থার সংকট একটি বড় উদাহরণ। নির্বাচন গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গভীর অনাস্থা তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলের অংশগ্রহণহীনতা, নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন এবং ফলাফল নিয়ে বিতর্ক—এসবই দেখায় যে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আর স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে এক পক্ষ অন্য পক্ষের বৈধতাকেই স্বীকার করতে চায় না। ফলে মতের ভিন্নতা এখানে গণতান্ত্রিক শক্তি নয়, বিভাজনের উৎস হয়ে দাঁড়ায়।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে। Facebook, YouTube এবং X–এর মতো প্ল্যাটফর্মে মত প্রকাশের সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে বেড়েছে মতের সংঘাত। এখানে মানুষ সাধারণত নিজের মতের সঙ্গে মিল আছে এমন গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, ফলে তৈরি হয় একধরনের “echo chamber”। ভিন্ন মতের প্রতি সহনশীলতা কমে গিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষ ও অপপ্রচার বেড়ে যায়—যা বিভাজনকে আরও গভীর করে।অন্যদিকে শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক মেরুকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একসময় মুক্ত চিন্তা ও আদর্শিক বিতর্কের জায়গা ছিল। কিন্তু বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে সেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ই প্রধান হয়ে উঠেছে। ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়শই সহিংসতায় রূপ নেয়, এবং ভিন্ন মতের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মত প্রকাশে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করে। এতে করে শিক্ষাঙ্গন, যা হওয়া উচিত যুক্তি ও মতবিনিময়ের ক্ষেত্র, তা বিভাজনের প্রতিচ্ছবিতে পরিণত হচ্ছে।
এছাড়াও রাজনৈতিক বিভাজন এখন ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলছে। একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য অনেক সময় দ্বন্দ্ব তৈরি করছে। বন্ধুত্ব, সহকর্মিতা—সব ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক পরিচয় একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করছে। ফলে সমাজে পারস্পরিক আস্থা ও সংহতি দুর্বল হয়ে পড়ছে।
গণমাধ্যম ও তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রেও বিভাজনের প্রভাব স্পষ্ট। তথ্যের চেয়ে মতাদর্শভিত্তিক ব্যাখ্যা ও অপতথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এতে করে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং ভিন্ন মতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে।
এই কেস স্টাডিগুলো একত্রে একটি বাস্তবতা তুলে ধরে—বাংলাদেশে মতের ভিন্নতা এখনও রয়েছে, কিন্তু সেই ভিন্নতাকে ধারণ করার মতো সহনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে ভিন্ন মত গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে অনেক ক্ষেত্রেই বিভাজনকে তীব্র করে তুলছে।
মতের ভিন্নতা বনাম বিভাজন: কোথায় পার্থক্য?
মতের ভিন্নতা এবং বিভাজনের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। মতের ভিন্নতা মানে হলো চিন্তার বৈচিত্র্য, যা একটি সমাজকে সমৃদ্ধ করে। এটি নতুন ধারণা, নতুন সমাধান এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়। কিন্তু বিভাজন হলো সেই ভিন্নতাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া দূরত্ব, অবিশ্বাস এবং শত্রুতা।
যখন একটি সমাজে ভিন্ন মতকে সম্মান করা হয়, তখন সেখানে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়। কিন্তু যখন ভিন্ন মতকে দমন করা হয় বা অবজ্ঞা করা হয়, তখন তা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য অনেকটাই নষ্ট হয়ে গেছে।
সমাধানের পথ: কী করা প্রয়োজন?
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সংলাপের সংস্কৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা। নির্বাচনব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য যাচাই, অপপ্রচার প্রতিরোধ এবং ভিন্ন মতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থায় সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ ঘটাতে হবে। শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে কীভাবে যুক্তির ভিত্তিতে মতবিনিময় করতে হয় এবং ভিন্ন মতকে সম্মান করতে হয়।সবশেষে বলা যায়, নাগরিকদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। গণতন্ত্র কেবল একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়; এটি একটি সংস্কৃতি, যা প্রতিটি মানুষের আচরণ ও মনোভাবের ওপর নির্ভর করে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে মতের ভিন্নতার সম্ভাবনা, যা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে; অন্যদিকে রয়েছে বিভাজনের বাস্তবতা, যা সমাজকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
প্রশ্নটি তাই এখন আর কেবল তাত্ত্বিক নয়; এটি বাস্তব। আমরা কি ভিন্নমতকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করতে শিখব, নাকি সেটিকে বিভাজনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করব? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলা।
লেক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর,

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়