চিররঞ্জন সরকার
আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হবে। প্রতি বছরই বাজেট আসে, আলোচনা হয়, প্রশংসা-সমালোচনাও হয়। কিন্তু এবারের বাজেট অন্য অনেক বছরের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি এমন এক সময়ে আসছে, যখন দেশের অর্থনীতি নানা ধরনের চাপে আছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতির সংকট বুঝতে বড় বড় পরিসংখ্যানের প্রয়োজন নেই। বাজারে গেলেই তার প্রমাণ মেলে। কয়েক বছর আগেও যে টাকা নিয়ে মানুষ এক সপ্তাহের বাজার করতেন, এখন সেই টাকায় হয়তো কয়েক দিনের বেশি চলে না। চাকরির বাজারে গেলে দেখা যায়, হাজার হাজার তরুণ ডিগ্রি হাতে ঘুরছেন, কিন্তু কাজের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলছেন, নতুন বিনিয়োগের সাহস পাচ্ছেন না। ব্যাংকে গেলে শোনা যায় আমানত, ঋণ আর খেলাপি ঋণ নিয়ে উদ্বেগের কথা। অর্থাৎ অর্থনীতির নানান সমস্যা এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে।জানা যায়, সরকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে। এটি চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বড়। কাগজে-কলমে এটি নিঃসন্দেহে বড় বাজেট। কিন্তু বড় বাজেট মানেই ভালো বাজেট নয়। প্রশ্ন হলো, এই বিপুল অর্থ কোথা থেকে আসবে এবং তা কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় করা যাবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক পরিস্থিতিতে আছে, যেখানে একদিকে আয় বাড়ছে না, অন্যদিকে খরচ থেমে নেই। অনেক পরিবারের বাস্তবতা এখন এমন যে মাসের শেষে হাতে টাকা থাকে না। বেতন বাড়লেও বাজারের দামের সঙ্গে তাল মেলানো যাচ্ছে না। অর্থনীতিবিদরা এ ধরনের পরিস্থিতি স্ট্যাগফ্লেশন বলেন। সাধারণ মানুষের ভাষায় এর অর্থ হলো—জীবন ক্রমেই ব্যয়বহুল হচ্ছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী আয় বাড়ছে না।গত কয়েক বছর ধরে অর্থনীতির ভেতরে ভেতরে কিছু সমস্যা জমছিল। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ডলারের সংকট, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সেই সমস্যাগুলো আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খাত। ছোট দোকানদার, পরিবহন শ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কিংবা গ্রামের নানান পেশার মানুষের বড় অংশ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেননি।এই অবস্থায় সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আয়। জানা যাচ্ছে, সরকার প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অর্থনীতির গতি যখন ধীর, ব্যবসা-বাণিজ্য যখন চাপের মধ্যে, তখন এই অতিরিক্ত রাজস্ব কোথা থেকে আসবে? অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রায় প্রতি বছরই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এবারও এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
অন্যদিকে সরকারের ব্যয়ও কমছে না, বরং বাড়ছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি, সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধ, উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় এবং সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা—সব মিলিয়ে সরকারের খরচের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ফারাক তৈরি হলে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু ঋণ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আজকের ঋণ আগামী দিনের বোঝা হয়ে ফিরে আসে।
এখন দেশের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি হলো কর্মসংস্থান। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ চাকরির বাজারে আসছেন। কিন্তু সেই তুলনায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। অনেক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়ে বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায়। আবার অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বলছে, তারা প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না। অর্থাৎ শিক্ষা ব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের মধ্যে একটি স্পষ্ট দূরত্ব তৈরি হয়েছে।এই সমস্যার সমাধান শুধু বড় বড় সেতু, সড়ক বা অবকাঠামো নির্মাণে নেই। কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনভিত্তিক উদ্যোগকে উৎসাহ দিতে হবে। কারণ বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অধিকাংশ কর্মসংস্থান তৈরি হয় ছোট ও মাঝারি ব্যবসা থেকেই।
ব্যাংকিং খাতের অবস্থাও উদ্বেগজনক। বছরের পর বছর খেলাপি ঋণ বেড়েছে। কিছু ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক আমানতকারী এখন তাদের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। অর্থনীতিতে ব্যাংকের ভূমিকা অনেকটা মানুষের শরীরের রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থার মতো। সেখানে সমস্যা তৈরি হলে পুরো অর্থনীতিই তার প্রভাব অনুভব করে। ব্যাংক দুর্বল হলে ঋণপ্রবাহ কমে যায়, বিনিয়োগ কমে যায়, ব্যবসা সংকুচিত হয়।
ডলার সংকটও দেশের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। কয়েক বছর আগে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে যে আত্মবিশ্বাস ছিল, এখন তা অনেকটাই কমে গেছে। শিল্প উদ্যোক্তারা কাঁচামাল আমদানিতে সমস্যার কথা বলছেন। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোজ্যতেল, ডাল, গম, চিনি, জ্বালানি থেকে শুরু করে প্রায় সব আমদানিনির্ভর পণ্যের খরচ বেড়েছে। এর পুরো চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।মধ্যবিত্তের অবস্থাও সহজ নয়। একসময় যারা মাস শেষে কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারতেন, তাদের অনেকেই এখন সংসারের খরচ সামলায়ই হিমশিম খাচ্ছেন। সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ বিল—সবকিছুর ব্যয় বেড়েছে। ফলে করব্যবস্থা নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর চাপ কমানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
কৃষিখাতের গুরুত্বও নতুন করে উপলব্ধি করার সময় এসেছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির মূল ভিত্তি এখনো কৃষি। কৃষকের হাতে টাকা গেলে সেই টাকা দ্রুত স্থানীয় বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। দোকানদার, পরিবহনকর্মী, দিনমজুর—সবারই কিছু না কিছু লাভ হয়। তাই কৃষিতে ভর্তুকি, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, সংরক্ষণ সুবিধা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো শুধু কৃষির উন্নয়ন নয়; পুরো অর্থনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
আয় ও সম্পদের বৈষম্যও একটি বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। একদিকে অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে বিপুল সম্পদ জমা হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করছে। অর্থনীতির জন্য এটি সুখকর নয়। কারণ বাজারে চাহিদা তৈরি হয় মূলত মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের খরচের মাধ্যমে। তাদের হাতে টাকা কমে গেলে অর্থনীতির গতি কমে যায়।আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়ের দক্ষতা। বাংলাদেশে বড় বড় প্রকল্প হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু অনেক প্রকল্প সময়মতো শেষ হয় না, ব্যয়ও কয়েক দফা বাড়ে। ফলে জনগণের টাকার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। শুধু বড় বাজেট করলেই হবে না; সেই বাজেটের অর্থ কতটা সঠিকভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এখন অর্থনীতির আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত আবহাওয়া কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। উপকূলের বহু মানুষ জীবিকা হারিয়ে শহরমুখী হচ্ছেন। এতে শহরের অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের ওপর নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে। তাই জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগ এখন সময়ের দাবি।
সব মিলিয়ে এবারের বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের অঙ্ক নয়, মানুষের আস্থা অর্জন। সরকার কত বড় বাজেট দিল, সেটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই বাজেট সাধারণ মানুষের জীবনকে কতটা স্বস্তি দিতে পারে। মানুষ এখন শুধু বড় বড় সংখ্যা শুনতে চায় না। তারা জানতে চায়, বাজারে গেলে খরচ কমবে কি না, চাকরির সুযোগ বাড়বে কি না, ব্যবসা করার পরিবেশ উন্নত হবে কি না।বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন কোনো জাদুকরি সমাধানের অপেক্ষায় নেই। প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, স্থিতিশীল নীতি এবং মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ। বাজেট যদি কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, কৃষি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর একটি বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা দিতে পারে, তাহলে বর্তমান সংকট কাটিয়ে ওঠার পথ তৈরি হতে পারে।
তাই এবারের বাজেট শুধু একটি অর্থনৈতিক দলিল নয়; এটি আমির খসরু মাহমুদের জন্যও একটি বড় পরীক্ষা। তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা যে সরকার শুধু অর্থনীতির সমস্যাগুলো দেখছে না, সেগুলোর সমাধানের পথও খুঁজছে। কারণ অর্থনীতির শেষ কথা জিডিপি, রাজস্ব বা বাজেটের আকার নয়; অর্থনীতির শেষ কথা মানুষ। মানুষের হাতে কাজ থাকলে, পকেটে টাকা থাকলে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ থাকলে তবেই অর্থনীতি সত্যিকার অর্থে এগিয়ে যায়। এবারের বাজেট সেই আশার ভিত্তি তৈরি করতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট।

