প্রতিদিনের ডেস্ক:
শিক্ষাখাতের উন্নয়নে যে কোনো দেশের মোট জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ বিনিয়োগের সুপারিশ করে জাতিসংঘের শিক্ষাবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো। বাংলাদেশে শিক্ষায় বরাদ্দের হার সবসময় কম। বিগত এক দশকে প্রস্তাবিত অধিকাংশ বাজেটে জিডিপির ২ শতাংশের নিচে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কোনো অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটে ২ শতাংশ বা তার একটু বেশি বরাদ্দ দেওয়া হলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমে ২ শতাংশের অনেক নিচে নেমে আসে।শিক্ষা-সংশ্লিষ্টরা এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানিয়ে আসছেন। তারা ধারাবাহিকভাবে শিক্ষায় জিডিপি অনুপাতে বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। একই সঙ্গে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ অর্থ ব্যয়ে দুর্নীতি রোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের সুপারিশ করে আসছেন।নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি মেনে এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়িয়েছে। বাজেটে জিডিপির ২ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে চার বছর পর আবারও জিডিপির ২ শতাংশ বরাদ্দ পেল দেশের শিক্ষাখাত। একই সঙ্গে এ বরাদ্দ ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়ে ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার।বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণাকালে শিক্ষাখাতে এ বরাদ্দের প্রস্তাব করেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রায় আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেন তিনি।খাতভিত্তিক বরাদ্দ তুলে ধরার সময় শিক্ষা প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, নানামুখী উদ্যোগ বাস্তবায়নে শিক্ষাখাতে আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত করে সর্বমোট এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করছি, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা এবং জিডিপির ১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
শিক্ষায় সবশেষ ৫ অর্থবছরে বরাদ্দ কত
২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ বরাদ্দ রেখেছিল। ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ১ দশমিক ৬৯ শতাংশে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নেয়। গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা। দায়িত্ব গ্রহণ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান ঘটায় অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষাখাত উন্নয়ন ও সংস্কারে মনোযোগী হবে বলে প্রত্যাশা থাকলেও তা দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঘোষিত প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষাখাতে জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৭ শতাংশ বরাদ্দ রাখেন।গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইশতেহার ঘোষণা করে বিএনপি। তাতে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং পর্যায়ক্রমে তা ৫ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দেন। ক্ষমতায় এসে তাদের ঘোষিত প্রথম বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়িয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপির ২ শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ রেখেছে বিএনপি সরকার।
শিক্ষায় টাকার অঙ্কে বরাদ্দে ‘মেগা জাম্প’
জিডিপির অনুপাতে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ খুব বেশি না বাড়লেও টাকার অঙ্কে বরাদ্দ বেড়েছে। অনেকে এটিকে ‘মেগা জাম্প’ বলেও উল্লেখ করছেন।গত অর্থবছর (২০২৫০২৬) অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষায় বরাদ্দ প্রস্তাব করেছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। এবার বিএনপির সরকার প্রস্তাব করেছে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। সেই হিসাবে টাকার অঙ্কে শিক্ষায় বরাদ্দ বেড়েছে ৪৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটে ৭১ হাজার ৯৫১ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮১ হাজার ৪৪৯ কোটি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮৮ হাজার ১৬২ কোটি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯৪ হাজার ৭১০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল।তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে টাকার অঙ্কে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বেড়েছিল ৯ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেড়েছিল ৬ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়েছিল ৬ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা এবং ২০২৫-২৬ বরাদ্দ কমেছিল প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা।
বরাদ্দ বাড়ানোর চেয়েও জরুরি ব্যয়ের স্বচ্ছতা
শিক্ষাখাতে পর্যায়ক্রমে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকল্প গ্রহণ এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও দ্রুততা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। অনেক ক্ষেত্রে তারা বরাদ্দ বাড়ানোর চেয়ে ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও দীর্ঘসূত্রতা পরিহারে মনোযোগ দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো দেশে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানো খুবই জরুরি। সব সরকার এটা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় বসে। পরে তা ভুলে যায়। শিক্ষার উন্নয়ন ও সংস্কার চিন্তা তারা হারিয়ে ফেলে।’তিনি বলেন, ‘নতুন যে সরকার এখন; এবারই প্রথম বাজেট ঘোষণা করছে, তারা শিক্ষায় বরাদ্দ বেশ বাড়িয়েছে, যদিও তা পর্যাপ্ত নয়; তারপরও এটা ইতিবাচক। এখন বরাদ্দ-এ অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করার দিকে নজর দিতে হবে। কারণ দুর্নীতিপ্রবণ রাষ্ট্র কাঠামোয় বরাদ্দ অর্থ ব্যয়ে ব্যাপক নয়-ছয় ঘটে। সেটা কমিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি বরাদ্দ অর্থ যাতে অলস না থাকে, অর্থাৎ বরাদ্দ আছে কিন্তু ব্যয় করা গেলো না, এটা যেন না ঘটে সেদিকে নজর দিতে হবে।’

