প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক সংকট

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকসংকট একটি গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। কালের কণ্ঠে শনিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৪ হাজার ১০৬টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। এই বিশালসংখ্যক শূন্যপদ প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাজীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে এবং শিক্ষার্থীরা শিখন ঘাটতি নিয়ে পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হচ্ছে।এই সংকটের মূল একটি কারণ হলো মামলা জটিলতা। ২০১৩ সালে দেশের ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের পর শিক্ষকদের গ্রেডেশনসংক্রান্ত মামলা দীর্ঘদিন ধরে আদালতে ঝুলে আছে। ফলে ৩১ হাজার ৪৪৯টি পদে পদোন্নতি আটকে রয়েছে।প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি উভয় পক্ষই আইনি সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রধান শিক্ষকের শূন্যতা কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ নয়, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি করছে। একজন প্রধান শিক্ষককে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি কাজেও যুক্ত থাকতে হয়। প্রধান শিক্ষক না থাকা স্কুলগুলোতে একজন সহকারী শিক্ষক যখন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন, তখন তাঁর পক্ষে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং প্রশাসনিক কাজ উভয়ই সামলানো কঠিন।এর ফলে যে স্কুলটিতে পাঁচজন শিক্ষক থাকার কথা, সেটিতে কার্যত চারজন বা তারও কম শিক্ষক দিয়ে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলোতে এই সংকট আরো প্রকট।
সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই সংকট সমাধানে দ্রুত প্রধান শিক্ষক নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি একটি সুষ্ঠু নিয়োগপ্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়েছেন, যেখানে অভিজ্ঞ ও তরুণ উভয় ধরনের শিক্ষককেই সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছেন। তাঁর এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়, কিন্তু আইনি জটিলতা নিরসন না হলে এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন অপরিহার্য। প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণ না হলে শিক্ষার মানোন্নয়ন কেবল একটি স্বপ্নই থেকে যাবে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন আইনি জটিলতার দ্রুত সমাধান, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নিয়োগপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করা। সরকারের উচিত, শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এই সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড্ত—এই কথাটি শুধু মুখে বললেই চলবে না, এর বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হবে কার্যকর নীতিমালায় এবং সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণে। প্রধান শিক্ষক সংকট নিরসনে যথাসময়ে পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তিই হয়ে পড়বে দুর্বল ও ভঙ্গুর।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়