১৭ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ৩০শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

নির্বাচন-পরবর্তী অর্থনীতি

বিশ্বব্যাংকের সদ্যঃপ্রকাশিত ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রসপেক্টাস’-এর জানুয়ারি সংস্করণে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কে যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তা দীর্ঘদিনের চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আশাবাদের একটি জানালা খুলে দিয়েছে। সংস্থাটির মতে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৬ শতাংশ হলেও আগামী অর্থবছরে তা ৬.১ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। এই পূর্বাভাসের মূলে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাঁকবদল—২০২৬ সালের শুরুতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন এবং পরবর্তী সরকারের সংস্কারমুখী পদক্ষেপ। ফলে বিষয়টি কেবল ইতিবাচক সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করছে না, বরং বর্তমানের চ্যালেঞ্জগুলোকে মনে করিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রানীতির কঠোরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকঋণের প্রবাহ কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কসংক্রান্ত ঝুঁকি সত্ত্বেও প্রবৃদ্ধি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনার মূল চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যে আস্থা ফিরে আসবে, তা অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে বলে আশা করা যায়।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো নতুন সরকারের কাছ থেকে কাঠামোগত সংস্কারের প্রত্যাশা। একটি নির্বাচনের পর সাধারণত সরকার নতুন উদ্যমে সংস্কার কর্মসূচি হাতে নেয়। যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং শিল্প সহায়ক নীতিমালা বাস্তবায়ন করা যায়, তবে বেসরকারি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বব্যাংক মনে করছে, মানুষের ভোগ ব্যয় বাড়বে এবং মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে, যা প্রবৃদ্ধির চাকাকে আরো সচল করবে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় প্রবৃদ্ধির লড়াইয়ে বাংলাদেশের অবস্থান খুব একটা পিছিয়ে নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক থেকেই অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি যেখানে মাত্র ২.৫৮ শতাংশ ছিল, এবার তা বেড়ে সাড়ে ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ধীরে হলেও তার সক্ষমতা ফিরে পাচ্ছে। তবে এই ঘুরে দাঁড়ানোর পথটি কণ্টকহীন নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পাল্টা শুল্ক আরোপের ঝুঁকি এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই হবে আগামী সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে পুঁজি করে যদি দ্রুত কাঠামোগত সংস্কার শুরু করা না যায়, তবে বিশ্বব্যাংকের এই ইতিবাচক পূর্বাভাস অর্জন করা কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি অতীতে বহুবার প্রমাণ করেছে, সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে তা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম। এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কারণ নেই। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক স্থিতি ফিরে এলে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়িত হলে অর্থনীতি আবারও শক্ত ভিত্তিতে দাঁড়াতে পারবে—এমনটাই আশা।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়