আমাদের অর্থনীতি কয়েক বছর ধরেই ধুঁকছে। করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, অবরোধ—এসবের ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে। তদুপরি অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে অর্থনীতির প্রায় পঙ্গু দশা। বিনিয়োগে স্থবিরতা, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, বেকারত্ব বৃদ্ধি, ব্যাংকঋণের অত্যধিক সুদসহ নানা কারণে দেশের শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যের রীতিমতো করুণ অবস্থা। এর মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে হামলা চালায় ইরানে। ইরানও পাল্টা হামলা শুরু করে। সেই যুদ্ধ এখন তৃতীয় সপ্তাহে পড়েছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট তীব্র হয়েছে।প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে চলে গেছে। মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়ছে। এভিয়েশন খাতসহ কিছু ব্যবসায় রীতিমতো ধস নামছে। বাংলাদেশেও পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুদ্ধের ক্ষতিকর প্রভাব ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বাড়ছে পরিবহন ব্যয়। সেই সঙ্গে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত চার মাসে মূল্যস্ফীতি ক্রমাগতভাবে বেড়েছে এবং গত ফেব্রুয়ারি মাসে তা ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। যুদ্ধের কারণে তা আরো দ্রুত বাড়তে পারে।
এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্ভোগ ক্রমেই বাড়ছে। আয় ও ব্যয়ের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ফেব্রুয়ারির শেষার্ধে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারকে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ এক কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে। ধারণা করা হয়েছিল, নির্বাচিত সরকার খাদে পড়া অর্থনীতিকে টেনে তোলার জোরদার উদ্যোগ নেবে। বিনিয়োগে গতি আসবে। জ্বালানিসংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাবে শিল্প-কারখানা। সরকারের গৃহীত উদ্যোগগুলো দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করবে। কিন্তু সবকিছুই নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতিতে আরো গভীর সংকট তৈরি হতে পারে। এমনিতেই সরকারের রাজস্ব আয়ে বড় ঘাটতি রয়েছে, তা আরো বাড়তে পারে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় জোগানদাতা হচ্ছে রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয়। সেখানেও বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
গতকাল প্রকাশিত অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী ৪৭৫টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এক লাখ ১০ হাজারের বেশি যাত্রী, যাঁদের বেশির ভাগই প্রবাসী শ্রমিক। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। এভিয়েশন খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যুদ্ধের প্রভাবে তাঁদের কার্যক্রম ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমে গেছে। ফ্লাইট বন্ধ থাকলেও এয়ারলাইনসগুলোর প্রশাসনিক ব্যয়, মেইনটেন্যান্স ও পার্কিং চার্জ থেমে নেই। মধ্যপ্রাচ্যকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে ইউরোপ, আমেরিকা ও অন্যান্য গন্তব্যে পরিচালিত বৈশ্বিক এয়ারলাইনসগুলোরও আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অনেক বিমান সংস্থার ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হবে। প্রবাস আয়ের প্রায় ৪৫ শতাংশ আসে জিসিসিভুক্ত বা উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে। রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চরম চাপ তৈরি হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে দ্রুত ও কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আমরা মনে করি, সরকার এ বিষয়ে সচেতন এবং সম্ভাব্য সব রকম পদক্ষেপ নিয়ে তারা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সক্ষম হবে।

