মাদকের সহজলভ্যতা এবং ক্রমবর্ধমান মাদকাসক্তির কারণে দেশ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। কি শহর, কি গ্রাম—সর্বত্রই মাদকের ছড়াছড়ি। মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই খুনাখুনি হচ্ছে। আক্রান্ত হচ্ছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরাও।তরুণ-যুবকরা তো আছেই, কিশোর বয়সী, এমনকি কিশোরীরাও ক্রমেই বেশি করে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদক ক্রয়ের অর্থ জোগাতে তারা জড়িয়ে যাচ্ছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা ধরনের অপরাধে। গড়ে উঠছে ‘কিশোর গ্যাং’। তার পরও বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে মাদক প্রবেশ করছে দেদার।
গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে অতি বেদনাদায়ক এক চিত্র।
জানা যায়, ভারত ও মায়ানমার থেকে স্থল ও জল উভয় সীমান্তপথেই প্রচুর পরিমাণে মাদক চোরাচালান হয়ে আসছে। তারপর সেগুলো নানাভাবে ছড়িয়ে যাচ্ছে রাজধানীসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি রেলপথে মাদক পরিবহন অনেক বেড়ে গেছে।
চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, বেনাপোল, আশুগঞ্জসহ পূর্ব রেলের বিভিন্ন স্টেশনে পাচারকারীদের দেখা মিলছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার তিন সীমান্তবর্তী উপজেলা কসবা, আখাউড়া ও বিজয়নগর হয়ে আসা মাদক ট্রেনে পাচার করা হয়। আখাউড়া রেলওয়ে থানার তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে (নভেম্বর) এই থানার অধীন জেলার ১১টি রেলস্টেশন এলাকায় বিভিন্ন ট্রেনে ২৫০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসব অভিযানে ২১ জন চোরাকারবারিকে আটক করা হয়েছে। মাদকপাচারে নেওয়া হচ্ছে অভিনব সব কৌশল।নারী ও শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। মাদক পাচার করতে গিয়ে কেউ সাজছেন রোগী, কেউ বা ‘গর্ভবতী’।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), র্যাব, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়ার জল ও স্থল সীমান্ত, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার কম হলেও ৩০টি পয়েন্ট দিয়ে দেশে ইয়াবা আনছেন পাচারকারীরা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, নাইক্ষ্যংছড়ি, টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলা দিয়ে পাহাড়, নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর ব্যবহার করে বাংলাদেশে মাদক পাচার করে আনা হচ্ছে। কক্সবাজার থেকে সড়ক ও নৌপথের পাশাপাশি রেলপথে ইয়াবাপাচারের তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযান পরিচালনাকারী আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সরকার পরিবর্তনের পর মাদকপাচারের রুটেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। সীমান্ত এলাকায় বিকল্প পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে। মাদকদ্রব্যের মধ্যে ইয়াবা, ক্রিস্টাল মেথ ও আইসের পাশাপাশি হেরোইন ও কোকেন পাচার হয়ে আসছে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) মতে, দেশে বর্তমানে প্রায় দেড় কোটি মাদকসেবী রয়েছে। মাদকসেবীদের সংস্পর্শে এবং মাদকের সহজলভ্যতায় দ্রুত বাড়ছে এই সংখ্যা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে সামাজিক অবক্ষয় ও ছোট-বড় প্রায় সব অপরাধের পেছনে অন্যতম প্রধান অনুঘটকের কাজ করছে মাদকাসক্তি। মাদকাসক্তদের প্রায় ৯০ শতাংশই কিশোর-তরুণ। মাদক ব্যবসার গডফাদাররা খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজিতে এই কিশোর-তরুণদের ব্যবহার করছেন। প্রকাশিত খবরাখবরে জানা যায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযানে কিছু খুচরা কারবারি, বিক্রেতা, বহনকারী ধরা পড়লেও শীর্ষ মাদক কারবারি বা গডফাদাররা অধরাই থেকে যান। তাঁরা প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেন।
আমরা আশা করি, মাদক নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে। সীমান্ত দিয়ে মাদকের অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। ছোট-বড় সব কারবারিকে আইনের আওতায় আনতে হবে। মাদকসংক্রান্ত মামলার বিচারকাজ দ্রুততর করতে হবে।

