১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

এডিপি বাস্তবায়ন এক দশকে সর্বনিম্নে

দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার বাস্তব চিত্র ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসা শুধু পরিসংখ্যানগত ব্যর্থতা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। এডিপি হলো সরকারের উন্নয়ন দর্শনের মূল চালিকাশক্তি। এই কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নই নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন।পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর তথ্য বলছে, জুলাই-নভেম্বর সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ১১.৭৫ শতাংশ, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায়ও কম। এই ধীরগতি উন্নয়ন চক্রকে কার্যত স্থবির করে তুলছে। আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী এই হার গত অর্থবছরের একই সময়ের ১২.২৯ শতাংশ থেকেও কম। সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ সত্ত্বেও এডিপি বাস্তবায়নে এই স্থবিরতা দেশের অর্থনীতির বিনিয়োগচক্রেও স্পষ্টতই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সবচেয়ে হতাশাজনক চিত্রটি দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্য খাতে। গত অর্থবছরের মতোই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে এডিপি বাস্তবায়ন তলানিতে, যা যথাক্রমে ৩.৯২ শতাংশ ও ১.৮১ শতাংশ মাত্র। যেখানে মানবসম্পদ উন্নয়নে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অত্যাবশ্যক, সেখানে এই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে বরাদ্দের ব্যবহার না হওয়া এক গুরুতর ব্যর্থতা। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিবার কল্যাণ কর্মসূচির অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, এই সময়ে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানো বা অব্যবহৃত রাখা ‘নিরাশাজনক’। কারণ এই ব্যয় সরাসরি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়ক।
পরিকল্পনা কমিশনের মতে, এই ধীরগতির কারণ হিসেবে প্রকল্প শুরুর বিলম্ব, তহবিল ছাড়ে জটিলতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার দুর্বলতা আজও বহাল রয়েছে। এর অনিবার্য ফলস্বরূপ অর্থনীতির বিনিয়োগচক্রে নতুন প্রকল্প কমে যাচ্ছে, কর্মসংস্থান হ্রাস পাচ্ছে এবং উৎপাদন সম্প্রসারণ থমকে আছে। এডিপি বাস্তবায়নে এই বেহালের কারণে চলতি অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেট থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কাটছাঁট করে তা দুই লাখ কোটি টাকায় নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হলে নির্মাণসামগ্রী, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ কিংবা সামাজিক অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও শ্লথ হয়ে পড়ে। সিপিডির মতে, এই সময়ে বরাদ্দ কমানো নিঃসন্দেহে ‘নিরাশাজনক’। কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না করে শুধু বরাদ্দ ঘোষণা বা নজরদারির কথা বললে বাস্তব চিত্র বদলায় না।
এডিপি বাস্তবায়নের এই বেহাল থেকে উত্তরণে প্রয়োজন শুধু প্রশাসনিক তাগিদ নয়; প্রয়োজন প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সংস্কার, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। উন্নয়ন পরিকল্পনা যদি কাগজেই আটকে থাকে, তবে প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সব দাবিই শেষ পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়