দেশের গণপরিবহনের সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে পরিচিত রেলওয়ে আজ নানা রকম সংকটে জর্জরিত। বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল ও জয়দেবপুর জংশন—দুটি আলাদা স্থান, কিন্তু সমস্যার মূল একই; পরিকল্পনায় ঘাটতি, ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং যাত্রীসেবায় অবহেলা। প্রকাশিত দুই প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, দেশের রেলব্যবস্থা আজ চরম নৈরাজ্যের মুখে দাঁড়িয়ে। সরকারের ব্যাপক বিনিয়োগ ও আধুনিকায়নের আশ্বাসের পরও মাঠ পর্যায়ে চিত্র উল্টো।পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে প্রতিদিন ১১৯টি ইঞ্জিন প্রয়োজন, কিন্তু সংকট রয়েছে অন্তত ৪০টির। ফলে আটকে থাকা ট্রেনসংখ্যা ২৪, যার মধ্যে ১৬টি পুরোপুরি বন্ধ। খোলা হচ্ছে জরুরি ইঞ্জিন, ব্যবহার করা হচ্ছে পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ লোকোমোটিভ; তাতে চলন্ত ট্রেনে ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা বেড়েছে। যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে, সময়সূচি ভেঙে পড়েছে।অবশ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নতুন ৩০টি ইঞ্জিন কেনার প্রক্রিয়া চলছে এবং পুরনো ইঞ্জিন সারাইয়ের কাজ চলছে। কিন্তু সংকট যখন বহুদিনের, তখন কেন আগেভাগে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি? কেন আজও জোড়াতালির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে? শুধু আশ্বাস নয়, জরুরি ভিত্তিতে আধুনিক ইঞ্জিন সংযোজন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।অন্যদিকে জয়দেবপুর রেল জংশন স্টেশনের অবস্থা রীতিমতো ভয়াবহ। রাজধানীর পাশে অবস্থিত শিল্পসমৃদ্ধ গাজীপুর থেকে লক্ষাধিক মানুষ প্রতিদিন ট্রেনে ঢাকায় যাতায়াত করে।
আছে বিপুল অর্থ উপার্জনের সুযোগও। তার পরও ৪৮টি আন্ত নগর ট্রেনের মধ্যে ১৫টির স্টপেজ নেই। যেগুলো থামে, সেগুলোতে আসনসংখ্যা চাহিদার ৬ শতাংশেরও কম। ফল—হয়রানি, ভোগান্তি ও বৈষম্য। গাজীপুরের মতো এলাকা যেখানে দেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমশক্তি কাজ করে, সেখানে রেলসেবা উন্নয়ন শুধু প্রয়োজন নয়, আবশ্যক।কমিউটার ট্রেনগুলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাওয়ার পর সুবিধা কমে গেছে, মাসিক টিকিটও বাতিল হয়েছে। ফলে সাধারণ ও নিম্ন আয়ের যাত্রীরা বঞ্চিত হচ্ছে।এই পরিস্থিতি প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা উচিত যে রেল শুধু পরিবহন নয়—অর্থনীতি, নগরায়ণ ও মানবিক সেবা ব্যবস্থারই অংশ। পূর্বাঞ্চলে কার্যকর ইঞ্জিন সংযোজন ও সার্ভিসিং সিস্টেম প্রতিষ্ঠা, জয়দেবপুরে সব আন্ত নগর ট্রেনের স্টপেজ নিশ্চিত, আসন বৃদ্ধি, বেসরকারি ব্যবস্থাপনার নীতিমালা পুনর্বিবেচনা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখন অপরিহার্য।বাংলাদেশের রেলব্যবস্থাকে আধুনিক, জনমুখী ও টেকসই করতে হলে এ ধরনের সংকট আর অব্যবস্থাপনার জায়গা থাকতে পারে না। রেলওয়েকে আধুনিক ও জনবান্ধব করার অঙ্গীকারের বিপরীতে মাঠ পর্যায়ের এই চিত্র হতাশার। পরিশেষে আমরা বলতে চাই, কেবল দুঃখ প্রকাশ বা নতুন প্রকল্পের প্রতিশ্রুতিতে যাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘব হবে না। রেলওয়েকে দুর্নীতিমুক্ত করে তদারকি জোরদার করতে হবে। পুরনো ইঞ্জিন মেরামতের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং যাত্রী চাহিদার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ট্রেন চলাচলের যৌক্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা এখন অপরিহার্য। রেলের চাকা যেন কেবল ‘জোড়াতালিতে’ না ঘোরে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

