উৎপল মণ্ডল,শ্যামনগর
শীতের কনকনে হাওয়া কিংবা প্রখর রোদ-কোনটি থামাতে পারেনা তাদের। সুন্দরবন নির্ভর মনজীবীদের জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির লড়াই যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। জল, জঙ্গল আর অনিশ্চয়তার মাঝেই তাদের জীবন কাটে। তেমনই এক সংগ্রামী দম্পতি বনবিবি মন্ডল (৬৫) ও নির্মল মন্ডল (৭০)। বসবাস করেন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের চুনকুড়ি গ্রামে। গ্রামটি একবারে সুন্দরবন ঘেঁষা চুনকুড়ি নদীর তীরে। প্রায় ৪ দশক ধরে অসুস্থ নির্মল মণ্ডলের সাথে নিয়ে সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করেই চলছে বনবিবির জীবন। নতুন করে নদীর ঘাড়বেঁকে খালে ভাসমান একটি ছোট নৌকা। নৌকার একপাশে জাল অন্য পাশে কাঁকড়া ধরার দোন। নৌকায় বইটা হাতে বসে নৌকা বাইছেন বয়সের ভারে নুয়ে পড়া বনবিবি মন্ডল। কথা বলতে বলতে উঠে আসে সুন্দরবনের চলার দীর্ঘ ৪০ বছরের গল্প-ভয় কষ্ট আর টিকে থাকার সংগ্রাম। বনবিবি মন্ডল বলেন, বয়স তো আর কম হয়নি, তাও এই হাল ছাড়িনি আমি। বাঁদায় জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ আর সঙ্গে ডাকাতের ভয়-কোনটাই থামাতে পারিনি আমাগো। সুন্দরবনের জীবিকার সন্ধানে যাওয়া মানেই প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নেওয়া। নদীতে কুমিরের ভয়, ডাঙায় বাঘের আতঙ্ক আর বনদস্যদের দাপট। তবুও জীবিকার তাগিদে নৌকা, জাল আর কাঁকড়া ধরার সরঞ্জামই হয়ে উঠেছে তাদের নিত্যসঙ্গী। স্বামী নির্মল মন্ডল অসুস্থ হলেও বিকল্প পথ না থাকায় আজও স্ত্রীর সঙ্গে বনে নামতে হয় তাকে। এই দম্পতির একমাত্র ছেলে সন্তান সঞ্জয় মন্ডলও একসময় বাবামায়ের পথ অনুসরণ করে সুন্দরবনে যেতে শুরু করেছিল। তখন এই দম্পতি ভেবেছিলেন, হয়তো এবার তাদের বিশ্রামের সময় এসেছে। কিন্তু সেই আশা বেশিদিন টিকেনি। কারণের কথা জানতে চাইলে বনবিবি মন্ডলের কণ্ঠ ভারী করে বলেন, থেকে সাত-আট বছর আগে ছেলেটা বাঁদায় গেলে ডাকাতরা তাকে ধুরে নিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে। আমরা গরীব মানুষ, টাকা জোগাড় করতে দেরি হলে খুব মারে ছেলেটারে অনেক নির্যাতন করে। পরে গ্রাম ধার-দেনা করে মুক্তিপনের টাক কোনভাবে জোগাড় করলিও ততক্ষণে ছেলেটার খুব মারধর করে। এতে ছাবালডা আমার শেষ হুয়ে যায়। ছেলেটা শারীরিকভাবে অসুস্থ হলে এরপর থেকে সে আর ভারী কাজ পারে না। একটা ছেলেই তো ছিল। তাকে হারানোর ভয়ে এরপর থেকে তাকে আর বনে যেতে দেই না—বলেন বনবিবি মন্ডল।ছেলে কর্মক্ষম না থাকায় সংসারের ভার আবারও ফিরে এসেছে এই দম্পতির কাঁধে। বয়স ও অসুস্থতা সত্বেও তারা বাধ্য হয়ে আজও সুন্দরবনের পথে নামেন। একদিন কাজ না করলে ঘরে চুলা জলে না-এটাই তাদের বাস্তবতা বনবিবি মন্ডল-নির্মল মণ্ডলের গল্পটি কোন ব্যতিক্রম নয়। সুন্দরবন ঘিরে এমন হাজারো জীবনের গল্প ছড়িয়ে আছে জল-জঙ্গলের ভেতরে। বনবিবি মন্ডলের নৌকা থেকে নেমে তাদের বাড়ির সামনে চুনকুড়ি নদীর পাড়ে দেখা মেলে আরেক বনজীবী পরিবারের। নদীর পাড়ে বেঁধে রাখা নৌকা থেকে মাছ ধরা জাল গোছাচ্ছিলেন ষাট ছুঁইছুঁই গোপাল মন্ডল। তাদের সংসারে রয়েছে দুই মেয়ে-একজনের বিয়ে হয়েছে, আরেকজন এখনো বাবার সংসারেই।গোপাল মন্ডল বলেন, ‘আমার জন্মেতেই (জন্ম থেকে) এই বনে। বাবা-ঠাকুর দাদাও এই কাজ কুরেছে। জানে ঝুকি তাও ছাড়তি পারিনা। বনে না গেলে পেট চলেনা।’ তিনি জানান, এই চার মাস আগে তার এক সহযোদ্ধা জেলেকে বনদস্যরা অপহরণ করে। অপহরণের পর শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। পরে মুক্তিপণ দিয়ে ফিরেছে। সেই ঘটনার পর কয়েক মাস বনে যেতে পারেননি তিনি। কিন্তু ধার দেনা বাড়তে থাকায় আবারও নৌকা নামাতে বাধ্য হয়েছেন।গোপালের স্ত্রী স্বরসতী মন্ডল বলেন, ‘স্বামী বনে গেলে সারাদিন বুক ধুরে (ধরে) থাকি। কখন কোন খবর আসে কেউ জানে না। কিন্তু বনে না গেলে ঘরে ভাত নাই-এটাই দুঃখ।’
একই সুর শোনা যায় তরুণ-বোনজীবী রফিকুল ইসলামের কন্ঠেও। বয়স মাত্র ২৮ বছর। দুই বছরের একটি সন্তান আর অসুস্থ মা নিয়ে তার সংসার। তিনি বলেন, ‘বিকল্প কাজ নাই। বোনের মাছ আর কাঁকড়াই আমাদের ভরসা। সরকার যদি অন্য কাজের সুযোগ দিতো, তাহলে কেউ জীবনের ঝুঁকি নিতো না।’ আরেক বনজীবী নারীর কমলা রানী বলেন, ‘আমরাও মানুষ। আমাদেরও বাঁচার অধিকার আছে। কিন্তু বাঁদায় (বনে) গেলি (গেলে) ভয় আর না গেলি (গেলে) অনাহার। দুইদিকেই মরার ভয়।’ স্থানীয় বনজীবীরা জানান, গত কয়েক বছর সুন্দরবনের বনদস্যুতা কিছুটা কমলেও পুরোপুরি নির্মূল হয়নি। গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পর পরিবর্তনের পর আবারও সক্রিয় কয়েকটি দস্যু দল। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদী ভাঙ্গন ও মাছ-কাঁকড়ার উৎপাদন কমে যাওয়ায় জীবন আরো কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ঋণের ফাঁদে পড়েছে।বনজীবীদের দাবি, শুধু নিষেধাজ্ঞা বা ভয় দেখিয়ে নয়-টেকসই বিকল্প জীবিকা, নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করলেই সুন্দরবন নির্ভর মানুষগুলো বাঁচার পথ খুঁজে পাবে।জল, জঙ্গল আর অনিশ্চয়তার এই লড়াইয়ে বনবিবি মন্ডল, গোপাল মন্ডল কিংবা রফিকুল ইসলামের মতো মানুষগুলো প্রতিদিন নিজের জীবন বাজি রেখে টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন- নিরবে অবহেলায়। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এই সংগ্রামী মানুষগুলোর ঘামে ই টিকে আছে সুন্দরবনকেন্দ্রিক এক বৃহৎ জনপদের জীবন ও অর্থনীতি।এ বিষয়ে সুন্দরবনের বনজীবীদের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা সুন্দরবন গবেষক ও লেখক সাংবাদিক পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, ‘সুন্দরবন নির্ভর বনজীবীদের জীবন শুধু দারিদ্র নয়, এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতার প্রতিচ্ছবি। বিকল্প জীবিকার অভাবে তারা জীবন ঝুঁকি নিয়ে বারবার বনে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে নয়-টেকসই কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ও কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই বনজীবীদের জীবন ও সুন্দরবন-দুটোই রক্ষা করা সম্ভব। বনজীবীরাই সুন্দরবনের নিরব প্রহরী।

