৯ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ  । ২২শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ 

অর্থসংকটে সরকার

সরকারের রাজস্ব আয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, তা এরই মধ্যে অতিক্রম করে গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের কিস্তিও শিগগিরই ছাড় হচ্ছে না। অথচ ব্যয়ের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারকে বেশি দামে জ্বালানি কিনে ভর্তুকি দিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতসহ বিভিন্ন খাতে যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে, সেগুলো পূরণ করতে হচ্ছে। নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে। চাপ রয়েছে পে স্কেল বাস্তবায়নের।
দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ-আসল পরিশোধের চাপও ক্রমে স্ফীত হচ্ছে। আরো অনেক ধরনের খরচের চাপ রয়েছে। আয়ের চেয়ে ব্যয়ের চাপ বেড়ে যাওয়ায় সরকার বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে। সংকট কাটাতে সরকার উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে সোয়া তিন বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, বাকি চার মাসে এই ঘাটতি লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রয়োজন বসে থাকে না। রাষ্ট্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানা খাতে বেশ মোটা অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। তাই সরকার বাধ্য হয়েই ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ধার করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, অর্থবছরের ৯ মাসেই ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ প্রায় এক লাখ ৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বেসরকারি খাত ঋণ পাবে না। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও হবে না। পরিণামে তা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আরো কমিয়ে দেবে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার শুধু অভ্যন্তরীণ উৎস থেকেই ঋণ নিচ্ছে তা নয়, বৈদেশিক উৎস থেকেও ঋণ নিচ্ছে। ইআরডি বলছে, বর্তমানে দেশের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ ২৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। ফলে প্রতিনিয়ত সুদে-আসলে ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে ঋণ পরিশোধে বরাদ্দ ছিল প্রায় এক লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা, যা আগামী বছর আরো বাড়তে পারে। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এই পরিস্থিতিতে সঠিক নীতি গ্রহণ না করলে দেশ ঋণের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা যাতে একটা ঋণফাঁদের মধ্যে না পড়ি, এটা মূল টার্গেট হতে হবে এই সরকারের। বুঝলাম যে এখন তাদের জ্বালানিসহ বিভিন্ন কারণে ঋণ নিতে হচ্ছে। বিভিন্ন কিছু সামাল দিতে হচ্ছে। তাদের ইলেকশনে দেওয়া আশ্বাস যেগুলো আছে, সেগুলো বাস্তবায়নে তাদের একটা বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে সম্পদ আহরণ, রাজস্ব কিভাবে আমরা বৃদ্ধি করতে পারি, সেদিকে।’
বৈশ্বিক পরিস্থিতিও নানা ধরনের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। জ্বালানিসহ জরুরি আমদানি ব্যয় আরো বাড়তে পারে, রপ্তানি কমে যেতে পারে, রেমিট্যান্স বা প্রবাস আয়ে প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা, ভর্তুকিসহ নানা খাতে ব্যয় আরো বাড়তে পারে। তাই সরকারকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় কার্যকর পরিকল্পনা সাজাতে হবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির ওপর আরো বেশি নজর দিতে হবে।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়