অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর এ দেশের সাংবাদিকতার জন্য একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। শান্তিতে নোবেলজয়ীর নেতৃত্বাধীন সরকারের এই সময়টি সাংবাদিকদের জন্য ছিল সবচেয়ে অশান্তির। বাংলাদেশে আর কখনো সাংবাদিকরা এমন জঘন্য হামলা, মামলা, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হননি। এ সময় মামলাবাজি হয়েছে, মামলার আসামি করে চাঁদাবাজি হয়েছে। উদ্ভট মামলা হয়েছে, আবার এসব মামলায় গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।প্রতিবেদনে এমন অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।ইউনূস জামানায় সাংবাদিক নিপীড়নের বিষয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের গবেষণায়ও উঠে এসেছে অনেক তথ্য। অভ্যুত্থান-পরবর্তী ১৮ মাসে অন্তত ৮১৪ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। সংগঠনটির প্রকাশিত পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ৫৮৫ জন সাংবাদিক হামলার শিকার হন।হত্যা মামলার আসামি হয়েছেন ১৭৪ জন, হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি হয়েছেন ১২ জন, নাশকতা মামলার আসামি ৩৭ জন এবং সরাসরি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ছয়জন সাংবাদিক। প্রতিবেদনে জানা যায়, কুড়িগ্রামের উলিপুর থানার বুড়াবুড়ী সাতভিটা এলাকার চাঁদ মিয়ার ছেলে আশিকুর রহমান দীর্ঘদিন ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত ছিলেন। আন্দোলনের উত্তাল সময়ে চিকিৎসার জন্য তাঁকে ঢাকার সাবেক পিজি হাসপাতালে আনা হয়। ছাত্র পরিচয় দিলেই বিনামূল্যে চিকিৎসা নেওয়া যায় এমনটা জানতে পারায় চাচার কূটকৌশলে বিবাহিত-অছাত্র আশিক বনে যান ছাত্র। আন্দোলনের সঙ্গে লেশমাত্র সম্পর্ক না থাকলেও বনে যান আন্দোলনকারী।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হলে তিনি হয়ে যান জুলাই শহীদ। গেজেটেও ওঠে তাঁর নাম, মেলে সরকারি অর্থ সহায়তাও। আর চূড়ান্ত পর্যায়ে তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা হয়, যেখানে আসামি করা হয় কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জেলা প্রতিনিধি আব্দুল খালেক ফারুক, নিউজ২৪ টেলিভিশনের প্রতিনিধি হুমায়ুন কবির সূর্য এবং এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের প্রতিনিধি ইউসুফ আলমগীরকে। এমন ঘটনা আরো অনেক। এমনকি এসব মামলায় যাঁদের বাদী করা হয়েছে, তাঁরাও জানেন না কাদের আসামি করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা না নেওয়া হলেও ভবিষ্যতে এমন একটি সময় আসবে, যখন তাঁরা তাঁদের ওপর হওয়া এই অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেন।
গত রবিবার সম্পাদক পরিষদের প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সারা দেশে চলা সাংবাদিক নিগ্রহের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ২৮২ জন সাংবাদিকের একটি তালিকা হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্যে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত রয়েছেন ৯৪ জন সাংবাদিক। সম্পাদক পরিষদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিকদের বিষয়টি প্রতিকারের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে আগেই নির্দেশ দিয়েছেন।
আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী দ্রুত এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে প্রকৃত অর্থেই এ দেশে গণমাধ্যমের অবস্থান নিশ্চিত করা হোক।

