দেশের অর্থনীতির প্রাণ বা প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে বেসরকারি খাত। অথচ সেই বেসরকারি খাতের সংকট ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে।অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, উচ্চ সুদহার, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানিসংকট, পাহাড়সম খেলাপি ঋণ এবং বিনিয়োগবান্ধব নয় এমন করনীতি—এই চতুর্মুখী আক্রমণের শিকার হয়েছে আমাদের বেসরকারি খাত। আসন্ন জাতীয় বাজেট ঘিরে ব্যবসায়ীদের একমাত্র প্রত্যাশা, সরকার যেন বেসরকারি বিনিয়োগ চাঙ্গা করার লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।বেসরকারি খাত কতটা বিপর্যস্ত তার কিছুটা প্রমাণ মিলে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪.৭২ শতাংশে।
এটি দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এর আগে সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি হয়েছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার অর্থ হলো এই খাতে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে, উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, বেসরকারি খাতের এই সংকটের প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই পড়বে না, সামাজিক ক্ষেত্রেও পড়বে।বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান তৈরি হবে না, বেকারত্ব বাড়বে। আর বেকারত্ব বৃদ্ধি সামাজিক অস্থিরতারও কারণ হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১৩৮ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৫৪ কোটি ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১০.৪৩ শতাংশ। সামগ্রিক আমদানি প্রবণতায়ও নিম্নমুখী ধারা লক্ষ করা গেছে।মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ার এই ধারাবাহিক প্রবণতাকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের জন্য একটি বড় ধরনের নেতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে অনেক শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। জ্বালানিসংকট নিরসন না হলে বিনিয়োগের পরিবেশ ফেরানো কঠিন হবে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। পাশাপাশি ডলার সংকট, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা, উচ্চ সুদহার, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিসহ আরো অনেক কারণেই বেসরকারি খাতের সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে।বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তিই হলো বেসরকারি খাত। এই খাত যদি রুগ্ণ হয়ে পড়ে কিংবা মন্দায় আক্রান্ত হয়, তাহলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে বাধ্য। সরকারের মূল দায়িত্ব হলো বেসরকারি খাত যাতে অর্থনীতিতে পূর্ণ মাত্রায় অবদান রাখতে পারে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা।’ তিনি বলেন, ‘আসন্ন বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ চাঙ্গা করার জন্য সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ থাকতে হবে।’বেসরকারি খাতে গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার বড় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বন্ধ কারখানা চালু হবে, নতুন বিনিয়োগ বাড়বে এবং ২৫ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এর যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
দেশের বেসরকারি খাতে আস্থা ফেরাতে হবে। বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাই আসন্ন বাজেট বিনিয়োগবান্ধব হোক। সেই লক্ষ্যে বাজেটে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ও দিকনির্দেশনা থাকুক।

