এআই চাকরি কেড়ে নেবে, নাকি নতুন সুযোগ তৈরি করবে?

ড. হারুন রশীদ
প্রযুক্তির ইতিহাসে প্রতিবারই নতুন কোনো আবিষ্কার মানুষের মনে একই প্রশ্ন জাগিয়েছে—এবার কি মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে? আঠারো শতকের শিল্পবিপ্লবের সময় যন্ত্রচালিত তাঁত দেখে ব্রিটেনের বহু শ্রমিক আশঙ্কা করেছিলেন, তাঁদের জীবিকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। বিংশ শতাব্দীতে কম্পিউটার অফিসে প্রবেশের সময়ও বলা হয়েছিল, অসংখ্য চাকরি বিলুপ্ত হবে।
ইন্টারনেটের প্রসারের সময় একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো, প্রযুক্তি কখনো শুধু চাকরি ধ্বংস করেনি; বরং শ্রমবাজারের চরিত্র বদলে দিয়ে নতুন অর্থনীতি ও নতুন কর্মসংস্থানের জন্ম দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সেই ধারাবাহিকতারই সর্বশেষ এবং সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী অধ্যায়।
তবে এআই ঘিরে বর্তমান উদ্বেগ আগের যে কোনো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের চেয়ে গভীর। কারণ এটি শুধু শারীরিক শ্রম নয়, মানুষের চিন্তা, বিশ্লেষণ, লেখা, নকশা, অনুবাদ, প্রোগ্রামিং, এমনকি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কিছু অংশও সম্পন্ন করতে সক্ষম। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—এআই কি কোটি কোটি মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে, নাকি এটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে? বাস্তবতা হলো, দুটি সম্ভাবনাই একসঙ্গে সত্য।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের Future of Jobs Report 2025 অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে বিশ্বে প্রায় ৯২ মিলিয়ন বিদ্যমান চাকরি বিলুপ্ত বা রূপান্তরিত হতে পারে। কিন্তু একই সময়ে নতুন করে প্রায় ১৭০ মিলিয়ন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ নিট হিসাবে প্রায় ৭৮ মিলিয়ন নতুন চাকরি যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর অর্থ, সমস্যা চাকরি হারানো নয়; বরং নতুন ধরনের কাজের জন্য মানুষকে প্রস্তুত করতে না পারা।
একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)। সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরি কোনো না কোনোভাবে এআইয়ের প্রভাবে পরিবর্তিত হবে। উন্নত অর্থনীতিতে এই হার আরও বেশি। তবে IMF-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো—এআই অনেক চাকরিকে প্রতিস্থাপন করবে না; বরং মানুষের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে। যারা প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ হবে, তারা আগের চেয়ে আরও বেশি মূল্যবান হয়ে উঠবে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসির গবেষণাও একই চিত্র তুলে ধরেছে। তাদের মতে, আগামী দশকে কর্মীদের উল্লেখযোগ্য অংশকে নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের কর্মবাজারে একই পেশার ভেতরেও কাজের ধরন দ্রুত বদলে যাবে।
এই বাস্তবতা বাংলাদেশকেও সরাসরি স্পর্শ করবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় শক্তি হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই জনসংখ্যাগত সুবিধা তখনই সম্পদে পরিণত হবে, যখন তাদের দক্ষতা ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। অন্যথায় একই জনসংখ্যা বেকারত্ব ও সামাজিক অস্থিরতার কারণও হতে পারে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায়, এখনও মুখস্থনির্ভর শিক্ষা এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন প্রাধান্য পাচ্ছে। অথচ এআই এমন এক যুগের সূচনা করেছে, যেখানে তথ্য মুখস্থ রাখার চেয়ে তথ্য বিশ্লেষণ, সৃজনশীল চিন্তা, সমস্যা সমাধান, দলগত কাজ এবং যোগাযোগ দক্ষতার মূল্য অনেক বেশি। একটি এআই কয়েক সেকেন্ডে হাজারো তথ্য দিতে পারে, কিন্তু কোন তথ্যটি সঠিক, কোনটি প্রাসঙ্গিক এবং কোন সিদ্ধান্তটি মানবিক—সেই বিচারক্ষমতা মানুষেরই থাকতে হবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প, ব্যাংকিং, বীমা, টেলিযোগাযোগ, গণমাধ্যম, সফটওয়্যার, হিসাবরক্ষণ, গ্রাহকসেবা এবং সরকারি প্রশাসন—সব ক্ষেত্রেই এআইয়ের প্রভাব পড়বে। অনেক পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাবে। উদাহরণ হিসেবে কল সেন্টার, ডেটা এন্ট্রি, প্রাথমিক হিসাবরক্ষণ, সাধারণ অনুবাদ কিংবা রুটিন রিপোর্ট তৈরির কাজের চাহিদা কমতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে মানুষের কাজ শেষ হয়ে যাবে।
বরং নতুন ধরনের কাজ তৈরি হবে, যার অনেকগুলোর অস্তিত্ব আজ থেকে পাঁচ বছর আগেও ছিল না। এআই প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ার, মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞ, ডেটা অ্যানোটেশন বিশেষজ্ঞ, সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক, এআই নৈতিকতা বিশেষজ্ঞ, ডিজিটাল ফরেনসিক গবেষক, অটোমেশন পরামর্শক এবং মানব-এআই সমন্বয় ব্যবস্থাপক—এসব পেশা দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিক্ষা, পরিবহন এবং উৎপাদনশিল্পেও এআই-ভিত্তিক নতুন উদ্যোক্তার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য বিশেষ সম্ভাবনার একটি ক্ষেত্র হলো বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই প্রযুক্তি। বিশ্বের অধিকাংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনও ইংরেজিকেন্দ্রিক। অথচ বাংলা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাষা। বাংলা ভাষার জন্য উন্নতমানের এআই মডেল, ভয়েস প্রযুক্তি, অনুবাদ ব্যবস্থা, শিক্ষা সফটওয়্যার এবং কৃষি ও স্বাস্থ্যসেবার ডিজিটাল সমাধান তৈরির বিশাল বাজার রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যদি এই খাতে বিনিয়োগ বাড়ায়, তাহলে বাংলাদেশ শুধু প্রযুক্তির ভোক্তা নয়, উৎপাদক দেশ হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
ফ্রিল্যান্সিং খাতেও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের লক্ষাধিক তরুণ আন্তর্জাতিক ডিজিটাল বাজারে কাজ করছেন। এআইকে প্রতিযোগী না ভেবে সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করতে পারলে তাঁদের উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। একজন গ্রাফিক ডিজাইনার দ্রুত ধারণা তৈরি করতে পারবেন, একজন সফটওয়্যার ডেভেলপার দ্রুত কোড লিখতে পারবেন, একজন গবেষক দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারবেন এবং একজন সাংবাদিক তথ্য সংগ্রহে সময় বাঁচিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বেশি মনোযোগ দিতে পারবেন। তবে আশার পাশাপাশি সতর্কতারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
এআই ইতোমধ্যে ভুয়া ছবি, কণ্ঠস্বর এবং ভিডিও তৈরির মাধ্যমে ডিপফেকের নতুন সংকট সৃষ্টি করেছে। নির্বাচন, আর্থিক লেনদেন, সামাজিক সম্প্রীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এটি বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, কপিরাইট, অ্যালগরিদমিক বৈষম্য এবং সাইবার অপরাধও বাড়ছে। তাই এআই ব্যবহারের পাশাপাশি শক্তিশালী আইনি কাঠামো, নৈতিক নীতিমালা এবং ডিজিটাল সচেতনতা গড়ে তোলা অপরিহার্য।
সরকারেরও এখন সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রয়োজন। জাতীয় এআই নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি স্টার্টআপে অর্থায়ন, সরকারি সেবায় দায়িত্বশীল এআই ব্যবহার এবং কর্মজীবী মানুষের পুনঃদক্ষতা উন্নয়নের জন্য বড় আকারের কর্মসূচি নেওয়া জরুরি। বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যে ‘রিস্কিলিং’ ও ‘আপস্কিলিং’-কে জাতীয় অগ্রাধিকার দিয়েছে। বাংলাদেশ যদি এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে, তাহলে প্রযুক্তি ব্যবহারের বাজার থাকলেও প্রযুক্তি তৈরির বাজারে আমাদের অবস্থান দুর্বল থাকবে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ঘটাতে হবে আমাদের মানসিকতায়। এখনও অনেকে এআইকে এমন একটি প্রযুক্তি হিসেবে দেখছেন, যা মানুষকে অপ্রয়োজনীয় করে তুলবে। বাস্তবে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা হবে মানুষ বনাম এআই নয়; বরং এআই ব্যবহার করতে সক্ষম মানুষ বনাম এআই ব্যবহার করতে অক্ষম মানুষের মধ্যে। প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে নয়, প্রযুক্তিকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েই ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে টিকে থাকতে হবে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার লিখেছিলেন, ‘পুরাতনকে লইয়া নূতনের সৃষ্টি’। এআইয়ের যুগেও সেই কথাই সত্য। পুরোনো দক্ষতা সম্পূর্ণ বাতিল না করে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাকে যুক্ত করাই হবে সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমত্তা। একজন ভালো শিক্ষককে এআই প্রতিস্থাপন করবে না; বরং আরও কার্যকর শিক্ষক বানাতে পারে। একজন দক্ষ চিকিৎসককে এআই অপ্রয়োজনীয় করবে না; বরং আরও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। একজন সৃজনশীল লেখক বা শিল্পীর মূল্যও কমবে না; বরং তাঁর সৃষ্টিশীলতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
অতএব, এআই ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি চাকরি হারানোর নয়, প্রস্তুতির। আমরা কি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং মানবসম্পদকে সেই ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করছি? আমরা কি তরুণদের এমন দক্ষতা দিচ্ছি, যা আগামী দশকের কর্মবাজারে প্রাসঙ্গিক থাকবে? যদি উত্তর ইতিবাচক হয়, তাহলে এআই বাংলাদেশের জন্য নতুন শিল্প, নতুন উদ্যোক্তা, নতুন কর্মসংস্থান এবং উচ্চ আয়ের অর্থনীতির ভিত্তি হতে পারে। আর যদি আমরা প্রস্তুত না হই, তাহলে একই প্রযুক্তি আমাদের দক্ষতার ঘাটতি আরও স্পষ্ট করে তুলবে।
প্রযুক্তি কখনো ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না; ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে মানুষ। এআইও তার ব্যতিক্রম নয়। এটি কারও চাকরি কেড়ে নেওয়ার জন্য আসেনি, আবার কাউকে সাফল্য উপহার দিতেও আসেনি। এটি কেবল একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। যে সমাজ শেখার সাহস রাখে, পরিবর্তন গ্রহণ করে এবং দক্ষতায় বিনিয়োগ করে, সেই সমাজই এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুফল পায়। বাংলাদেশের সামনেও সেই সুযোগ উন্মুক্ত। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের—আমরা কি এআইকে ভয় করব, নাকি ভবিষ্যৎ নির্মাণের সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করব?
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।

আরো দেখুন

Advertisment

জনপ্রিয়