সরকার পরিবর্তনের পর সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে নীতি সুদ হার বা রেপো রেট বাড়িয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় নিত্যপণ্য নয় এমন পণ্যের চাহিদাও কমে গেছে। এতে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের বিক্রিতে ধস নেমেছে।
সুদহার অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা সম্প্রসারণের চিন্তা কিংবা নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা আপাতত বাদ দিয়েছেন অনেক উদ্যোক্তা।
গতকাল প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, নীতি-কৌশল ও অগ্রাধিকার বাছাইয়ে কোথাও ছন্দঃপতন হয়েছে, যার ফলে অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা চলছে। নানা সংকটের মুখে পড়েছে শিল্প। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা যাচ্ছে না।
ছাড়িয়ে গেছে দুই অঙ্কের ঘর। থমকে আছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। দেশের ব্যবসায়ী-রপ্তানিকারকরা দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ছন্দঃপতন দেখছেন। তাঁরা বলছেন, ভালো চলছে না সার্বিক অর্থনীতি।
তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি নেই। উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসার প্রসার থেকে শুরু করে নতুন বিনিয়োগ করতে পারছেন না। এর সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি তাঁদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। ব্যাংক খাতে অনিয়ম আর কয়েকটি ব্যাংকের দেউলিয়া হওয়ার মতো খবর ও অপপ্রচারে বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও ছড়িয়েছে আতঙ্ক-আস্থাহীনতা। ঋণের উচ্চ সুদহার, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিসহ সব কিছু মিলিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান তার পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না।
উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। চাহিদামতো ঋণপত্র (এলসি) খোলা যাচ্ছে না। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর টিকে থাকাই এখন চ্যালেঞ্জ।
অন্যদিকে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য গঠিত টাস্কফোর্স গঠনের পর সাড়ে চার মাস পার হলেও এক টাকাও ফেরত আসেনি। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, সরকার একদিকে সুদহার বাড়িয়ে রেখেছে, পাশাপাশি রয়েছে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি; অন্যদিকে এখন পর্যন্ত জ্বালানি সমস্যার সুরাহা হয়নি, বরং নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে কথা হচ্ছে। এই বিষয়গুলো পরিষ্কার করে দেয় যে সরকারের কার্যক্রম শিল্প খাতের জন্য ইতিবাচক নয়। এভাবে চললে নতুন শিল্প স্থাপন দূরের কথা, বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য টিকে থাকা কঠিন হবে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভঙ্গুর অর্থনীতির দৈন্যদশা কাটাতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। কমে যাচ্ছে রপ্তানি আয়, শিল্পের উৎপাদন। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, এই সরকারের এজেন্ডায় অর্থনীতি যতটা গুরুত্ব পাওয়া দরকার ছিল, সেভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে না। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খারাপ। তা থেকে উত্তরণের জন্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বসা, সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখতে পাচ্ছেন তাঁরা।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সার্বিকভাবে অর্থনীতি, বিশেষ করে বিনিয়োগ পরিস্থিতি দুর্বল। তাঁদের মতে, অর্থনীতির গতি ফেরানোর জন্য সবচেয়ে বড় বাধা অনিশ্চয়তা। বর্তমানে দেশে একটি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা আছে। তাঁরা মনে করছেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা না কাটলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটবে না।
আমরা মনে করি, দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প ও বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ বিদ্যমান থাকা জরুরি। অর্থনীতির বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে উঠতে অস্থিরতা দূর করতে হবে। এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত হবে না, যাতে দেশের শিল্পায়ন ব্যাহত হয় এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির গতি কমে যায়।

